ব্রেকিং নিউজ
Home | শিল্প সাহিত্য | ফিচার | রাজস্ব আয়ের উৎস হতে পারে হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা

রাজস্ব আয়ের উৎস হতে পারে হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা

ফরহাদ চৌধুরী, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি, ৭ ফেব্রুয়ারী, বিডিটুডে ২৪ডটকম ॥ মাত্র ৬ কিলেমিটার রাস্তা ও একটি ব্রীজের অভাবে পর্যটন এলাকা হিবেবে গড়ে উঠছে না হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এটি শুধু বনাঞ্চলই নয়, রেমা-কালেঙ্গা সুন্দরবনের পরেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। যা হবে সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চল ১৪ হাজার ৬শ ৩২ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠা। এই বনাঞ্চলের বয়স প্রায় ১শ বছর। এখানে রয়েছে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ৭ প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরিসৃপ, বিলুপ্ত প্রায় উতবা, কাইম, চশমা বানরসহ ৬০ প্রজাতির বন্য প্রাণী এবং ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ। নয়নাভিরাম ছোট-বড় পাহাড়, টিলা ও ১টি লেক, ২শ ফুট উঁচু পর্যবেক্ষন টাওয়ার যা পর্যটকদের খুব সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে। মাত্র ৬ কিলোমিটার সড়ক ও করাঙ্গি নদীর উপর ১টি ব্রীজের অভাবে চরম বিড়ম্বনা পোহাতে হয় বিধায় র্পযটকদের সংখ্যা একেবারেই কম। পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে সরকারি-বেসরকারি কটেজ। এতোসব সুযোগ সুবিধা থাকার পরও কালেঙ্গা অরণ্যে যাওয়ার মতো কোনো রাস্তা নেই।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত ৮ হাজার গাছ চুরি হয়েছে। বিগত বছর মাত্র ৫৫টি গাছ চুরি হয়েছে। তবে বাস্তবে এর পরিসংখ্যান আরও বেশী হবে বলে স্থানীয়রা জানান।

 বন বিভাগ আরও জানায়, নজির, নূহ, কালাসহ ১১টি বনদস্যু বাহিনীর নেতৃত্বে দুই সহস্রাধিক গাছ চোর এসব অপরাধ সংঘটিত করে আসছিল।
এ ব্যাপারে কালেঙ্গা বিট অফিসার আব্দুল আহাদ বলেন, তিনি যোগ দেয়ার পূর্বে গাছ কাটার মহোৎসব ছিল। যেখানে প্রতি বছর গড়ে আড়াইহাজার গাছ কাটা হতো সেখানে মাত্র ৫৫টি গাছ কাটায় কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট আকবর হোসেন জিতু সিএমসি’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাবার পর স্থানীয় গাছচোর, দুস্কৃতিকারীদের সাথে একাধিক সভা, উঠান বৈঠক, বন মামলা থেকে অব্যাহতিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়।
তাছাড়া আইপ্যাকের মাধ্যমে গরু, ছাগল পালন, বাঁশ-বেত, মৎস্য চাষের উপর প্রশিক্ষন ও প্রশিক্ষণ শেষে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং বাগান সৃজন করাসহ বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োজিত করা হয়।
আর এসব কর্মসূচীর মাধ্যমে বনের উপর নির্ভরশীলদের গাছ পাচার থেকে রোধ করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, জনবল সংকট ও লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় বন রক্ষায় আমাদেরকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল না হওয়ার কারণে অনেক সময় খবর পেয়েও আমরা জরুরী ভিত্তিতে কিছু করতে পারি না।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে অবশ্যই দেশের অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিগনিত হবে। আর পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠলে স্থানীয় অধিবাসীদের নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। তাহলেই এলাকায় অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে।
এ ব্যাপারে ডেপুটি রেঞ্জার মোঃ তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সুন্দরবনসহ দেশের সবক’টি বনাঞ্চলে চাকুরীর সুবাধে দেখার সুযোগ হয়েছে।
কিন্তু এর মতো সুন্দর একটি বন যা নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যরে এক অন্যতম স্থান। এটিকে যদি পর্যটনের আওতায় আনা যায় তাহলে রেমা-কালেঙ্গা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিকভাবে একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠবে।
এ ব্যাপারে সিএমসি’র (বন রক্ষায় সহ ব্যবস্থাপনা কমিটি) সভাপতি পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট আকর হোসেন জিতু বলেন, সিএমসি’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি গাছচোর, কুখ্যাত বনদস্যু, বনের আশপাশ এলাকার লোকজনদেরকে নিয়ে বিভিন্ন সময় উঠান বৈঠক, সভা ও সমাবেশ করেন। এর পর তিনি বন মামলায় জর্জরিত ব্যক্তিদের মামলা থেকে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্ত করা, আইপ্যাকের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন কর্মসূচী করার মধ্য দিয়ে বনদস্যুদের গাছ চুরি থেকে রোধ করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি জানান, যারা গাছ পাচারের সাথে জড়িত পাওয়া গেছে তাদেরকে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
যে কারনে এখন গাছ পাচার নেই বললেই চলে। তিনি আরও বলেন, দেশ স্বাধীনের পর এ অভয়ারণ্যে বহুবার অত্যাচার চালানো হয়েছে। বাধাহীনভাবে পাচার হয়েছে লাখ লাখ টাকার মূল্যবান গাছ।
বন বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায়, রেমা-কালেঙ্গা বনে কর্মকর্তা কর্মচারিদের ১শটি পদ থাকলেও অর্ধেকেরও বেশি পদ শূন্য।
নেই যানবাহন ও লজিস্টিক সাপোর্ট। যে কারনে বিশাল এ বনাঞ্চলে গাছ চোররা হানা দিলে তাদেরকে আটক করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। যে সময় যে সরকার থাকে সেই দলের ছত্রছায়ায়, দূর্নীতিবাজ বন কর্মকর্তা, কর্মচারী, বনরক্ষী ও বনদস্যুদের থাবায় বিলীন হয়ে পড়েছে রেমা-কালেঙ্গার রশিদপুর বনবিট। খোদ বনবিভাগ এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। পরবর্তীতে বিরাণ হওয়া এ বনভূমিকে সামাজিক বনায়নের আওতায় আবারও সবুজায়ন করা হয়েছে এবং কিছু অংশে সামাজিক বনায়নের কাজ চলছে। অবাধে গাছ কাটার পাশাপাশি মেরে ফেলা হয়েছে বনমোরগ, হরিণ, শুকরসহ নানা প্রজাতির পাখি।
তবে আশার কথা এই যে এই অভয়ারণ্য রক্ষায় কাজ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আইপ্যাক (সমন্বিত রক্ষিত এলাকা সহ-ব্যবস্থাপনা), সিএমসি (বন রক্ষার সহ ব্যবস্থাপনা কমিটি), বনবিভাগ ও স্থানীয় জনসাধারণ।
গাছ চুরি রোধে ইতিমধ্যেই বনের উপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার লোক, ৪টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের আয় রোজগারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে পুরোপুরিভাবে গাছ কাটা বন্ধ করতে হলে বনের নির্ভরশীল বনদস্যুদের বন মামলা থেকে অব্যাহতি ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার উপর জোর দিলেন এলাকাবাসী। এ ব্যাপারে স্থানীয় রাণীগাও ইউপি সদস্য মোঃ সিরাজুল ইসলাম বলেন, বন রক্ষায় ৬টি টহল বাহিনী রয়েছে এবং তাদের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
পাশপাশি অবৈতনিক এ টহল দলের সকলকে বৈতনিক করতে হবে।
তাছাড়া বনের উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দেয়া হলে গাছ পাচার অবশ্যই রোধ করা যাবে।
এ ব্যাপরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা মোঃ হাসিম সরকার বলেন, হরিন ও বন মোরগসহ বিভিন্ন প্রাণী অবাধে শিকার করা হতো। এখন গাছ কাটা অনেকটা রোধ করা গেছে।
তনি বলেন, পুরোপুরি গাছ কাটা বন্ধ করতে হলে বনের উপর নির্ভরশীল গরীবদেরকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
আদিবাসী রমেশ দেব বর্মা বলেন, স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বাশ-বেত, গরু-ছাগল প্রদানসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বনের উপর নির্ভরশীলদের অন্তর্ভূক্ত করায় এখন সকলেই মোটামোটি ভালোভাবে বাস করতে পারছে।
শুধু সড়ক, অবকাঠামো ও ব্রীজ নির্মাণ করলেই হবে না। পাশপাশি রেমা-কালেঙ্গার জীববৈচিত্রের সাথে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিতে হলে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন বলে মনে স্থানীয় জনগণ ও বনবিভাগ।
তাছাড়া পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলে সরকার প্রচারের উদ্যোগ নিলে এলাকায় পর্যটকদের ভীড় বাড়বে।
সৃষ্টি  হবে অসংখ্য কর্মসংস্থান ও প্রতি বছর বিপুল পরিমান রাজস্ব আয় হবে সরকারের।

x

Check Also

বাংলাদেশ ও পর্তুগাল বর্ধিত আন্তঃ-সংসদীয় সহযোগিতায় সম্মত

আনোয়ার এইচ খান ফাহিম, ইউরোপীয় ব্যুরো প্রধান, পর্তুগাল: বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জনাব ...

পর্তুগালে বঙ্গবন্ধু ক্রিকেট টুর্নামেন্ট২০২২ এ “লিসবন সিক্সার’স” বিজয়ী

আনোয়ার এইচ খান ফাহিম ইউরোপীয় ব্যুরো প্রধান, পর্তুগালঃ ২৪ মে বাংলাদেশ দূতাবাস ...