Home | আন্তর্জাতিক | প্রণোদনার ১৬ মাসেও স্থিতিশীলতা আসেনি

প্রণোদনার ১৬ মাসেও স্থিতিশীলতা আসেনি

স্টাফ রিপোর্টার, ২৪ মার্চ, বিডিটুডে ২৪ডটকম : শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা ও ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রণোদনা ঘোষণা পরবর্তী ১৬ মাসে লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়ে ক্ষতি থেকে তীব্র ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যা বাজারের বিনিয়োগ মনোভাব ও আস্থার জায়গা ব্যাপক সংকটের মুখে পতিত হচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা, বিএসইসির এ প্রণোদনাকে এক প্রকার ব্যর্থ বলেই মনে করছেন। তাদের মতে,  বর্তমানে বাজার যে অবস্থায় চলছে এখান থেকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা কার্যকর পদক্ষেপ ও বাজারকে বিনিয়োগকারীদের অনুকুলে ধাবিত করতে না পারলে বাজার দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ২০১১ সালে মে মাসে পুর্নগঠনের পাঁচ মাসের মাথায় এসে ২৩ নভেম্বর সরকারের নির্দেশে বহুল আলোচিত প্রণোদনা ঘোষনা করে। এতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ২০ পদক্ষেপ নেয়াসহ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ স্কীম ঘোষণা করে। কিন্তু প্রণোদনা ঘোষণা পরবর্তী ১৬ মাসের মাথায় এসে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী একাধিকবার লোকসানে থাকা শেয়ার সমন্বয় করেও চরম লোকসানের মুখে রয়েছে। যা বাজারে বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত শেয়ারবাজারের ভবিষ্যত অশনি সংকেত দেখা দিতে পারে। একটা সময় আসবে যখন ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের সক্ষমতা অনুযায়ি বিনিয়োগ  ও ঋণের ক্ষেত্রে হিমসিম খাবে তখন শেয়ারবাজারে টাকার জন্য ধরণা দিয়েও কোন সমাধানের পথ থাকবে না।

এদিকে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর ১৬ মাস অতিবাহিত হলেও বাজারের স্থিতিশীলতা ও অধিকাংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের বিশেষ স্কীম সুবিধা পায়নি। বিএসইসির কর্মকর্তারা অবশ্য বাজারের স্থিতিশীলতা আসেনি বলে মানতে নারাজ। তাদের মতে, বিএসইসি আইন কানুন পরিবর্তন সহ একটি নিয়মের  মধ্যে বাজারকে আনতে কাজ করছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএসইসি শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। কারণ বিনিয়োগকারীদের নিয়ে শেয়ারবাজার কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের কোন ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে শুধু তাদের ইক্যুইটি হারিয়েছে।

এদিকে শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতার কোন ছাপ ফেলতে না পারায় বিএসইসির উপর সাধারন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে হতাশায় পরিণত হচ্ছে। তবে এসময়ের মধ্যে বিএসইসি উল্লেখযোগ্য  আইন সংস্কার ও বিধিমালা সংশোধনী অনুমোদন করেছে।

একইসঙ্গে সরকার বিএসইসি পূর্নগঠন নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাধারন মূল্য সূচক ছিল ৫,৮৯৯ পয়েন্ট এবং বাজার মূলধন ছিল ২ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। এরপরে ধারাবাহিক দরপতনের কারণে ২০১১ সালে ২২ নভেম্বর ডিএসইর সাধারন সূচক ছিল ৫২৭২ পয়েন্ট। পরবর্তীতে ১৬ মাসের মাথায় এসে ডিএসইর সাধারন মূল্য সূচক চলতি ২২ মার্চ ২০১৩ সালে দাঁড়ায় ৩৯৩৯ পয়েন্টে। একইসঙ্গে ডিএসইর নতুন সূচক চালু হওয়ার পর ডিএসইএক্স সূচক ৪০৫৫ থেকে নেমে আসে ৩৮৫৬ পয়েন্টে।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, বিএসইসি পূর্নগঠনের পর বাজার একটু স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়ার কিছুদিন না যেতে আবার পতনের মুখে পড়ে। তবে বিএসইসি পূর্নগঠনের প্রথম ১০ মাসের মাথায়  শক্তিশালী কমিশনের কার্যক্রমের আভাসও দেখা গেছে।

বিএসইসি এ সময়ের মধ্যে বেশকিছু আইনের সংস্কার পরিমার্জন পরিবর্ধন সংশোধন করেছে। এসব বিষয় নিয়ে বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক ছিল। কিন্তু ২০১২ সালে এপ্রিল থেকে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাইকোর্টে দায়ের করা রিট মামলাকে কেন্দ্র করে বাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ওই বছর জুন মাসে হাইকোর্ট উদ্যোক্তা পরিচালকদের রিটগুলো খারিজ করে বিএসইসির পক্ষে রায় দেন। কিন্তু এখনও ২ শতাংশ শেয়ার ধারনের ব্যর্থ পরিচালকদের বিষয়ে বিএসইসি পরিস্কার কিছু জানাতে পারেনি। এরপরে মন্দা বাজারে বিএসইসি একসঙ্গে বেশ কিছু কোম্পানির আইপিও এবং মাত্রারিক্ত প্রিমিয়ামে অনুমোদন, বাজার সেনসেটিভ কিছু কিছু তথ্য নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ না করা, সহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিকবার সময় বাড়ানো এবং তা কার্যকর করা নিয়ে সব ধরনের বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়েছে।

এদিকে বিএসইসির নেয়া বাজার সংস্কার কার্যক্রমের মধ্যে  রয়েছে ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন, বিএসইসি আইন, স্বতন্ত্র ক্যাপিটাল মার্কেট ট্রাইব্যুনাল ও এসইসির ১০ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনা।

এছাড়া উল্লেখযোগ্য আরো ৭টি বিধিমালা সংশোধনী অনুমোদন করেছে তারা। এগুলো হচ্ছে- কর্পোরেট গভার্নেন্স গাইডলাইন; সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুল ১৯৮৭; সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার) বিধিমালা, ১৯৯৬; সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিনিয়োগ উপদেষ্টা) বিধিমালা, ২০১২; সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রিসার্স এ্যানালাইসিস) রুলস ২০১২; প্রাইভেট প্লেসমেন্ট রুলস ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০০১ এর সংশোধনী। ইতিমধ্যে ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদনও হয়েছে তবে সংসদে পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। বন্ড মার্কেট চাঙ্গা করার জন্য বেশ কিছু নতুন বন্ড অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

পাশাপাশি বিএসইসি ১০ বছর মেয়াদী পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে। এগুলো হলো- কমিশনের সক্ষমতা,  লাকবল বৃদ্ধি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি; সরকারি অনুমোদন ব্যতীত কমিশনের নিজস্ব অর্থে বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতা, কমিশন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে অধিকতর সমন্বয়; কমিশনের জন্য একটি অত্যাধুনিক সার্ভিল্যান্স সিস্টেম প্রতিষ্ঠা, আইপিওর জন্য দীর্ঘমেয়াদী গাইডলাইন প্রণয়ন; পুঁজিবাজারের জন্য স্বতন্ত্র ক্যাপিটাল মার্কেট ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা; নিরীক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট প্রণয়ন, আর্থিক শিক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় নীতি প্রণয়ন; যথাসম্ভব বেশি সংখ্যক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কাঠামোর আওতায় আনা; স্টক এক্সচেঞ্জ সমূহের ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা; ডেভিডেভটিভ মার্কেট প্রতিষ্ঠা; স্বতন্ত্র ক্লিয়ারিং কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা; বন্ড মার্কেটের প্রসার। এছাড়া মার্জিন ঋণের অনুপাত শর্তানুযায়ী পর্যায়ক্রমে ১: ০৫ এ নামিয়ে আনা।

এ বিষয়ে  মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউস উর্ধ্বতন কর্মকতাদের আলাপকালে শেয়ারনিউজ ২৪ ডটকমকে জানান, ঘোষিত প্রণোদনার বিষয়ে তাদের আরো গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখা উচিত। কারণ এ সময়ের মধ্যে বাজারে সব পক্ষই কম-বেশি লোকসানের মধ্যে রয়েছে। একইসঙ্গে বাজারের জন্য বিএসইসির দীর্ঘ মেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়া খুবই সময়োচিত উদ্যোগ। যা বাজারে ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক। তবে তার আগে বর্তমানে বাজারে যেসব সমস্যা ও বিনিয়োগকারীরা আস্থাহীনতার মধ্যে রয়েছে সেখান থেকে উত্তোরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরী হয়ে উঠেছে বলে তারা মনে করেন।

এ বিষয়ে অর্থনতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, বিএসইসির ঘোষিত প্রণোদনা বাজারের স্থিতিশীলতায় কতটুকু ভূমিকা রেখেছে সেটা তারাই ভাল বলতে পারবে। তাদের ঘোষিত প্রণোদনা ভবিষ্যতে বাজারে কেমন প্রভাব ফেলবে সেটি পরের বিষয়। কিন্তু বাজারের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী বর্তমানে অনেক লোকসানের মুখে রয়েছে। এখান থেকে তাদের কিভাবে বের করে আনা যায় সেটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ন বলে তিনি মনে করেন।

x

Check Also

বাংলাদেশের পতাকার রঙে আলোকিত হলো অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের রাজধানী ব্রিসবেনের দুটি মূল স্থাপনা স্টোরি ব্রিজ এবং ...

অবশেষে বৈঠকে বসছে ভারত ও পাকিস্তান

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : দুই বছর পর সিন্ধুর জল বণ্টন নিয়ে মঙ্গলবার (২৩ মার্চ) ভারতের সঙ্গে ...