Home | অর্থনীতি | ব্যবসা ও বাণিজ্য | ৪০ হাজার তাঁত বন্ধ : মূলধনের অভাব

৪০ হাজার তাঁত বন্ধ : মূলধনের অভাব

tatস্টাফ রিপোর্টার : প্রয়োজনীয় মূলধন, অর্থ সংকট, দায়দেনা, তাঁতশিল্পে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার হস্তচালিত তাঁতশিল্প বিলুপ্তির পথে। সরকারিভাবে সহযোগিতা না পেয়ে অনেক তাঁতি তাদের আদি পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হস্তচালিত প্রায় ৪০ হাজার তাঁতকল বন্ধ পড়ে আছে।
আড়াইহাজারের পাশেই খৈরা বাজারে প্রতি হাটবারে কাঠের তৈরি পুরনো হস্তচালিত তাঁত মেশিন কাঠ হিসেবে বিক্রি করা হয়। এতেই ফুটে ওঠে হস্তচালিত তাঁত মেশিনের দুরবস্থার চিত্র। বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম মেশিনে কাপড় প্রস্তুত করা শুরু হওয়ার পর থেকে হস্তচালিত তাঁতকলগুলো বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান বন্ধ হওয়া তাঁতকল মালিকেরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তাঁতি পরিবারের উন্নয়নে ৮০ এর দশকে আড়াইহাজার সদরে সরকারিভাবে উপজেলা তাঁত বোর্ডের বেসিক সেন্টার স্থাপন করা হয়। তাঁত বোর্ডের অফিসটি তখন তাঁতিদের পদচারণায় মুখরিত থাকত। এই বেসিক সেন্টারের আওতায় তাঁতি সমিতির মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫০ হাজারেরও বেশি তাঁতি অন্তর্ভুক্ত হন। এই বেসিক সেন্টারের শুরুতে সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা ও ঋণ সুবিধা পেয়ে তাঁতি পরিবারগুলো অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। তখন বেড়ে গিয়েছিল তাঁত ও তাঁতির সংখ্য। এর অধীনে আড়াইহাজারসহ নারায়ণগঞ্জ জেলার সাত থানার তাঁতকলের হিসাব ও কর্মকা- পরিচালনা করা হতো এখান থেকে। কিন্তু যান্ত্রিক ও ইলেকট্রনিক সভ্যতার কাছে হার মানা তাঁতকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই তাঁত বোর্ডের অফিসের কার্যক্রমও ঝিমিয়ে পড়ে। এখন তাঁতিরাওই অফিসের অস্তিত্ব থাকে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা বোধ করছেন।
একসময় আড়াইহাজারের প্রায় প্রতিটি গ্রামে গড়ে দুই শতাধিক তাঁতকল ছিল। এ সক তাঁতকলে নানা প্রকার কাপড় উৎপাদিত হতো। বিশেষ করে ৭০ থেকে ৯০-এর দশককে তাঁতকলের স্বর্ণযুগ হিসেবে উল্লেখ করেন তাঁতিরা। ওই সময় শাড়ি থেকে শুরু করে চাদর, লুঙ্গি, গামছা ইত্যাদি তৈরি হতো এসব হস্তচালিত তাঁতকলে।

আড়াইহাজারের গোপালদী, রামচন্দ্রদী, কড়ইতলা, গহরদী, শালমদী, বিশনন্দী, শ্রীনিবাসদী, ক্ষিরদাসাদী, জোকারদিয়া, সুলতানসাদী, উচিৎপুরা, কাদিরদিয়া, আতাদী, ভৈরবদী, জাঙ্গালিয়া, বাড়ৈপাড়া, দাসিরদিয়া, সীতারামকান্দি, ইলমদী, সিংহদী, বল্লভদী, নারান্দী, কলাগাছিয়া, সিঙ্গারপুর, দড়িসিঙ্গারপুর, ফাউসা, মারুয়াদী, লস্করদী, ব্রাহ্মন্দী, মনোহরদী, পাঁচগাঁও, কামরানীরচর, দাসপাড়া, লাখুপুরা, বিনাইরচর, গাজীপুরা, মুকুন্দী, বাঘানাগর, দক্ষিণপাড়া, লালুরকান্দি, বগাদী, বাইলাট, কান্দাপাড়া, খন্দকার কান্দি, বারআনি, শম্ভুপুরা, পাঁচআনি, খাগকান্দা ইত্যাদি গ্রামে তাঁতকলের খট খট শব্দে আর তাঁত শ্রমিকদের কণ্ঠে নানা গানে মুখরিত হয়ে থাকত পুরো এলাকা।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হতো আড়াইহাজারের এসব গ্রামে তাঁতকলে উৎপাদিত কাপড়। স্থানীয়ভাবে দেশের বিখ্যাত কাপড়ের বাজার নরসিংদীর শেখেরচর, বাবুরহাট, সোনারগাঁওয়ের বারদী, রূপগঞ্জের তারাব, নোয়াপাড়া বাজারে কাপড় বিক্রি হতো সপ্তাহে এক দিন। এর মধ্যে শেখেরচরে প্রতি রোববার, বাবুরহাটে প্রতি সোমবার, বারদীতে প্রতি শুক্রবার, তারাব এবং নোয়াপাড়ায় প্রতি মঙ্গলবার তাঁতকলে উৎপাদিত কাপড় বিক্রি হতো। এসব হাট থেকে কাপড় কিনে পাইকারেরা বাজারজাত করতেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এভাবেই আড়াইহাজারের তাঁতকলে উৎপাদিত নানা প্রকার কাপড়ের বিস্তৃতি ও সুনাম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।
সেসময় রাস্তা-ঘাটের উন্নতি না থাকায় তাঁতিদের হেঁটে ওই বাজারে কাপড় নিয়ে যেতে হতো। তখন ভোররাত থেকে তাঁতিদের পদচারণায় রাস্তার আশপাশের বাড়িঘরের লোকজন ঘুম থেকে সজাগ হয়ে পড়ত। এমন দৃশ্য ৯০-এর দশকের পর থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ওই সময় একজন তাঁতি ১০টি তাঁতকলের মালিক থাকলে তাকে এলাকায় সবাই সমীহ করে চলতেন। এলাকার তাঁতকল ঘিরে তখন নানা প্রকার তাঁতি সমিতি গড়ে উঠেছিল।
তাঁতিরা আর্থিক সমস্যায় পড়লে ওই সমিতি থেকে তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো। প্রতিকূলতার মধ্যেও কোনো কোনো গ্রামে তাঁতিরা তাদের গুটি কয়েক তাঁতকল নিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে আছেন। এসব তাঁতকলে এখনো গামছা, লাল সালু, মার্কিন কাপড়, থ্রিপিস, বিছানার চাদর ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। আশানুরূপ মুনাফা না আসায় সেগুলোও এখন বন্ধ হওয়ার পথে।
উপজেলার হাইজাদী ইউনিয়নের কলাগাছিয়া গ্রামের থ্রিপিস উৎপাদনকারী তাঁতি জাকির হোসেন জানান, ‘থ্রিপিস উৎপাদন করে কয়েক সপ্তাহ খুব ভালোই লাভ হচ্ছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই বাজার একেবারে নি¤œমুখী হয়ে পড়েছে। তাই এ ব্যবসা ছেড়ে দেব ভাবছি।’ উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের সিঙ্গারপুর গ্রামের তাঁতকল মালিক আবদুর রাজ্জাক জানান, ‘তাঁতকল চালিয়ে ৮০-এর দশকে তার বেশ উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু দেশে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম কারখানাগুলো চালু হওয়ার পর থেকে তাঁত ব্যবসা একেবারে বসে পড়েছে। তাই এ ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।’
এলাকার অন্য তাঁতিরা জানান, বর্তমানে তাঁতি সমিতিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারীভাবে সাহায্য সহযোগিতা না পাওয়ায় তারা হস্তচালিত তাঁতকলগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। বিলুপ্ত প্রায় তাঁতশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারী উদ্যোগ ও আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।
এ ব্যাপারে জানতে আড়াইহাজার তাঁত বোর্ড অফিসে গিয়ে অফিস খোলা পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখা মিলেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

কেজিপ্রতি আদার দাম বেড়েছে ৭০ টাকা

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর বড় কাঁচাবাজার কারওয়ান বাজার। এখানে পাইকারি ও খুচরা- দু’ভাবে শাক-সবজি ...

ঈদে আখাউড়া স্থলবন্দরে ৬ দিনের ছুটি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি : পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও রফতানিমুখী ...