ব্রেকিং নিউজ
Home | শিল্প সাহিত্য | ফিচার | স্মৃতিতে তাহিরপুরের বহুল আলোচিত গণধর্ষণ ও মিডিয়ার ভুমিকা

স্মৃতিতে তাহিরপুরের বহুল আলোচিত গণধর্ষণ ও মিডিয়ার ভুমিকা

সেলিম আহমদ তালুকদার : সুনামগঞ্জে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের এক কর্মীর প্ররোচনায় সংখ্যালঘু পরিবারের কলেজ ছাত্রী (২৭) গণ ধর্ষণের স্বীকার হয়  গত ৩১ আগষ্ট শুক্রবার।

সীমান্তবর্তী তাহিরপুর উপজেলার লাওড়ের গড় শাহ আরেফিন এর মাজার সংলগ্ন এলাকায় ঐ কলেজ ছাত্রীকে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের আলী নুরের পুত্র আনোয়ার হোসেন খোকন বন্ধু সেজে বেড়াতে নিয়ে শাহ আরেফিন মাজার ও লিচু বাগানের পাশ্ববর্তী নির্জন জায়গায় নিয়ে ধর্ষণ করে। ন্যাক্কারজনক এ ঘটনার  শেষে বাড়ি ফেরার পথে  খোকনের নিকট থেকে ছাত্রীটিকে স্থানীয় কিছু বখাটে তুলে নিয়ে তাকে আবার পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এ সময় পাশে থেকে মোবাইল ফোনে পর্ণো ভিডিও চিত্র ধারণ করে রাখে কয়েকজন বখাটে। ঘটনার পরদিন  ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে এলাকার মোবাইল টু মোবাইলে আর পরিনত হয় টক অব দ্যা ভিলেজে।

এ ঘটনায় শালিসে মিমাংসা করার নামে  শুরু হয় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের অপতৎপরতা। শুরু হয় শালিসের নামে সময়ক্ষেপন। পুলিশ প্রশাসনের অবহেলার দরুন এক পর্যায়ে  ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এলাকার লোকজন।

ঘটনার ৬ দিন পর  ৬ সেপ্টম্বর সকালে  আমি ও আমার সহকর্মী সময় টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি হিমাদ্রি শেখর, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি মাহমুদুর রহমান তারেককে নিয়ে টেলিভিশনের জন্য ট্যাকেরঘাট খনি প্রকল্পের ভুমি দখল বিষয়ে প্যাকেজ নিউজ করার জন্য রওয়ানা হই।

যাওয়ার পথে মোটর সাইকেল চালক ইসমাইল ভাই বলল সেলিম ভাই একটি ভিডিও ফুটেজ কালের কন্ঠের শামিম ভাই বলছিল দেওয়ার জন্য।আপনার কি পেনড্রাইভ আছে? আমি বললাম সাথে মোবাইলের মেমোরিতে করে নিয়ে যাব। বাঘবেড় বাজারের একটি দোকান থেকে পর্ণো ভিডিও মেমোরিতে নিয়ে রওয়ানা হই বড়ছড়ায়।

যাওয়ার পথে লাওড়েরগড় পয়েন্টে চা খেতে নামি আমি ও হিমাদ্রী। এসময় এক চা বিক্রেতা আমাদের সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বলেন, আমরা তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ যাবনা। সিলেট গিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করব।

এই এত বড় ঘটনা কেউ পত্রিকায় লেখেনা।

তখন জানতে চাইলাম কি হইছে ভাই, আসল ঘটনাটি কি, খুলে বলুন তো ? তখন বিষয়টি শুনে সাথে সাথে তথ্য সংগ্রহ, বিক্ষোভ মিছিল ও ঘটনা স্থলের  ভিডি চিত্র ধারণ করতে শুরু করলাম। এক পর্যায়ে তাহিরপুর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোন করে বললাম ওসি সাহেব লাওড়েরগড়ে একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে জানেন কিনা ? উত্তরে তিনি বললেন, জানি। তবে কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ না করলে তো কিছু করা যাবেনা।

তাছাড়া এদের পরিচয় ও জানিনা। শুনেছি মেয়ের বাড়ি ময়মনসিংহ। এ কথাগুলো বলে শেষ করার পর আরেকবার কল বেক করলেন ওসি আর বললেন, সাংবাদিক সাহেব বিষয়টি সেনসেটিভ বুঝে শুনে নিউজ কইরেন।

আমি বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে। বিকেলে ফিরলাম শহরে। তখন সহকর্মীরা ফোন করে বললেন সেলিম আমাকে তথ্যটা একটু দিও। আমি আমার সাধ্যমত তথ্য দিয়ে সহযোগিতার চেষ্টা করি এবং আমি দৈনিক দিনকালে নিউজ পাঠাই।

পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর সকালে পত্রিকা আসার আগেই আমি ও তারেক জেলা প্রশাসকের একটি ইন্টারভিউ আনার  জন্য অফিসে যাই। সাক্ষাতকার নেয়া শেষে আমি গণধর্ষণের ঘটনাটি সম্পর্কে জেলা প্রশাসককে অবহিত করি। এবং জানাই যে, ঘটনাটির দৃশ্য এলাকার মোবাইল টু মোবাইলে ছড়িয়ে পড়ছে।
ডিসি সাহেব নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাকে প্রশ্ন করলে এক পর্যায়ে আমি জানাই যে, আমার মোবাইলে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা আছে।

ডিসি সাহেব বললেন, ঠিক আছে। সাথে সাথে এসপি সাহেবকে  ফোন করে বললেন, তাহিরপুরে গ্যাংরেফ  হয়েছে। এ ব্যাপারে মামলা নেয়া এবং ধর্ষকদের এরেষ্ট করার ব্যবস্থা করতে বলেন।

ঐদিন গণধর্ষণের খবরটি বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

ডিসি অফিস থেকে বের হয়ে আবার তাহিরপুর থানার ওসি সাহেবের কাছে ফিডব্যাক জানতে চাইলে তিনি বলেন মেয়ের পরিচয় পাওয়া গেছে এবং মামলার প্রস্তুতি চলছে। এসময় তিনি আরো বললেন ভাই মেয়ের পরিচয় পাওয়া গেছে। কৌশলে তাকে থানায় আনার ব্যবস্থা করেছি। এরপর বিকেলে ওসি সাহেব জানালেন ৮ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের হয়েছে এবং ঘটনার সাথে জড়িত একজন গ্রেফতার  হয়েছে।

মামলার আসামিরা হলেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের আলী নুরের ছেলে আনোয়ার হোসেন খোকন। সে সরকার সমর্থিত একটি  ছাত্র সংগঠনের স্থানীয় নেতা । অন্য আসামিরা হলেন, তাহিরপুর উপজেলার কোনাটপাড়া  গ্রামের আব্দুল হাসিমের ছেলে রুবেল মিয়া,আব্দুল ছাত্তারের ছেলে মোশাহিদ মিয়া, তাজুল ইসলামের ছেলে শামায়ুন কবীর, সাহিদাবাদ গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে সাইফুল্লাহ, জাবেদ মিয়ার ছেলে সাইদুর রহমান, আব্দুল হাই এর ছেলে আতাবুর, আব্দর রহিমের ছেলে শফিক।

৮ সেপ্টম্বর ঘটনার সাথে জড়িত আরো ৬ জনকে অভিনব কৌশলে গ্রেফতার করে তাহিরপুর থানা পুলিশ।

বহুল আলোচিত গণধর্ষণের ৭ আসামি গ্রেফতার হলে ও প্রধান আসামি খোকনকে  এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি তাহিরপুর থানা পুলিশ। এমন অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা হাওড় অঞ্চলে প্রত্যন্ত এলাকায় লোক চক্ষুর অগোচরে ঘটে। এবং প্রায়ই সেসব ঘটনা চাপা পড়ে যায়। এ ঘটনার ক্ষেত্রে ও এমনটি ঘটার প্রক্রিয়া চলছিল কিন্তু গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন এলাকাবাসীর তৎপরতার কারণে অপরাধীরা আজ বিচারের মুখোমুখি।

সেলিম আহমদ তালুকদার : লেখক, জেলা প্রতিনিধি, দিগন্ত টেলিভিশন ও দৈনিক দিনকাল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাপ্তাহিক সুনামগঞ্জের আলো

x

Check Also

‘গ্রেটার সিলেট এসোসিয়েশন ইন স্পেন’ নির্বাচনে মুজাক্কির – সেলিম প্যানেল বিজয়ী

জিয়াউল হক জুমন, স্পেন প্রতিনিধিঃ সিলেট বিভাগের চারটি জেলা নিয়ে গঠিত গ্রেটার ...

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাথে পর্তুগাল আওয়ামী লীগের মতবিনিময় সভা

আনোয়ার এইচ খান ফাহিম ইউরোপীয় ব্যুরো প্রধান, পর্তুগালঃ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোঃ শাহরিয়ার ...