Home | শিল্প সাহিত্য | ফিচার | সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতায় ন্যায়বিচার

সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতায় ন্যায়বিচার

জাহাঙ্গীর আলম সরকার : ’ন্যায়বিচার’ একটি নৈতিক আদর্শ, যা আইন অধিকারের সুরক্ষা ও অন্যায়ের শাস্তিতে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করে। ন্যায়বিচার ও আইন সমার্থক নয় কেননা বাংলাদেশে এমন কিছু আইন রয়েছে যে আইনগুলো ন্যায়বিচারের পরিপন্থি বলে অভিহিত। সে দিক বিবেচনায় দেশটিতে আইন ও ন্যায়বিচার সমীকৃত নয়। ইংল্যান্ডে আইন ও ন্যায়বিচার প্রায় সমীকৃত এবং মজার বিষয় হচ্ছে ইংল্যান্ডে Justice of the peace, Royal courts of Justice, Administration of justice প্রভৃতি শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে ন্যায়বিচার শব্দটি আইনব্যবস্থায় প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। সাংস্কৃতিক এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতায় ন্যায়বিচার যে সকল কারনে আটকা পড়ে আছে তা নিয়ে অত্র নিবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করেছি।
কলংক এবং লজ্জা আমাদের দেশের নারীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তীর ক্ষেত্রে একটি বৃত্বের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছে। নিরবতাই নারীদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা ন্যায়বিচারের প্রশ্নে। জেন্ডার ভিত্বিক নির্যাতন বন্ধ করা তখনই সম্ভব যখন নারীরা লজ্জা এবং কলংকের ভয়মুক্ত থাকতে পারবে। আমাদের দেশের নারীদের ’বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না’। এই নিরবতাই তাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে দূরে রেখেছে। বাংলাদেশে একজন ধর্ষিতা নারী আদালতে বিচার চাওয়ার পরিবর্তে নিরব থাকার চেষ্টা করেন কেননা এতে করে উক্ত নারীর সামাজিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার বিশাল ঝুকি থেকে বাচবার সম্ভবনা বেড়ে যায়। নারীরা সাংস্কৃতিক ্ও ঐতিহ্যগত ভাবেই কলংকের ভয় করে থাকে। একজন কলংকিত নারী সমাজে স্বীকৃত নয় আর তাই ধর্ষিতা হওয়ার পর এ সমাজ তাঁকে কলংকিত বলে উপহাস করে। যদিও আমাদের দেশে সম্প্রতি নারীর ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য শক্তিশালী আইন প্রনয়ন করা হয়েছে তথাপি এ কথা সত্য যে তাতে করে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রথাগত সমাজ ব্যবস্থার নেতিবাচক দিকগুলোর তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। সমাজ আজও মনে করে নারীর যৌন বিষয়ে কথা বলবার কিংবা মতামত প্রদান করবার কোন সুযোগ নেই, এটি একটি গোপন বিষয়। এ সমাজে নারীর তথাকথিত সতিত্বের মূল্যায়ন করা হয় যতটা না একজন নারীকে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ধর্ষিতা নারী নিজের প্রতি আস্থা হাড়িয়ে ফেলে এবং নোংরা ধারনা পোষন করতে শুরু করে।
আমাদের সমাজে কিছু খারাপ প্রথা রয়েছে যা নারীদেরকে যৌন বিষয় গোপন রাখতে উৎসাহিত করে। পরিবারের ভিতরে ও বাহিরে কোথাও নারীরা যৌন বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করবার প্রয়াস পায় না। উপযুক্ত শিক্ষা না পাওয়ার কারনে সমাজের এ সকল খারাপ প্রথা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এমনকি পারিবারিক নির্যাতনকেও আমাদের দেশে এখনো বিবেচনা করা হয় পরিবারের অভ্যন্তরীন একটি বিষয়। যদিও খুব সম্প্রতি এটি প্রতিরোধে আইন প্রনয়ন করা হয়েছে তথাপিও সত্যিকারের কোন পরিবর্তন আসেনি।
ধর্মীয় শৃংখল নারীদের জন্য নতুন কোন বিষয় নয়। সৃষ্টির শুরু থেকে অদ্যবদি ধর্মীয় নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করে নারীদের পথ চলতে হয়। পৃথিবীর নানা দেশে নানা রকমের ধর্ম রয়েছে আর এ সকল ধর্মে নারীদেরকে নানা প্রক্রিয়ায় শৃখলিত করা হয়েছে। উদাহরন হিসাবে বলা যেতে পারে দারফুরের কথা- সেখানে ধর্ষনের বিষয়ে নারীরা কোন কথা বলতে পারবে না কেননা তাঁদের ধর্মে এটা বাধা প্রদান করা হয়েছে। প্রায় সকল ধর্মেই যৌন বিষয়ে নারীদের দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও আইন রয়েছে নারীদের সুরক্ষার জন্য তথাপিও আমাদের দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা প্রতিবন্দকতাকে জয় করার জন্য আইনী কাঠামো আরও শক্তিশালি করা দরকার।
নারীর ন্যায়বিচারের প্রশ্নে পরিবহন ও দুরত্ব একটি মারাত্বক গুরত্বপূর্ন বিষয়। গ্রামের এমন ানেক নারী রয়েছে যারা শহরের আদালতে আসতে চায় না উপযুক্ত পরিবহন না থাকার কারনে কিংবা দুরত্বের বিষয়টি বিবেচনায় এনেও কেউ কেউ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখেন। ন্যায়বিচারের নিশ্চিতের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরত্বপূর্ন বিষয়। উদাহরন হিসাবে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের পাহাড় এলাকায় কিংবা নীলফামারী জেলার নদী এলাকার মতো বিভিন্ন এলাকার নারীরা দুর্গম পথ পারি দিয়ে আদালতে আসতে চায় না। একইভাবে জেন্ডার ভিত্বিক নির্যাতন একটি ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ যদি বিচারপ্রার্থী নারীরা আদঅরত থেকে অনেক দূরে কোন দুর্গম স্থানে বসবাস করেন। নেপালে এমন অনেক স্থান রয়েছে যেখানে নারীদের আদালতে আসতে ৭ দিন সময় লেগে যায়। অনেক নারীরা একা ভ্রমন করতে পারেন না তাদের দরকার একজন সঙ্গী আদালতে আসবার জন্য। সব দিক বিবেচনায় দুরত্ব এবং পরিবহন ন্যায়বিচারের নিশ্চিতের ক্ষে্েরত্র একটি বিবেচনায় বিষয।
আদালতের দর্নীতি নারীদের ন্যায়বিচারের প্রশ্নে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের নি¤œ আদালতে নারী বিচারপ্রার্থীরা বিভিন্ন ভাবেই অবিচারের শিকার। আদালত এলাকায় দুর্নীতি, প্রতারণা, বিচারপ্রার্থীদের মামলার প্রক্রিয়া সম্পর্কে না জানা ও অব্যবস্থাপনার কারণে পারিবারিক আদালতে দ্রত ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নারীরা। ন্যায়বিচার পেতে এসে নানা ধরনের অবিচারের শিকার হচ্ছে তারা। এ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এতে অপরাধ বাড়ছে, আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি হচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে অবৈধ লেনদেনের ফলে টাকাই হয়ে উঠছে বিচারের প্রধান মানদন্ড। নীলফামারী জেলার বিভিন্ন থানার মামলা সংশিষ্ট নারী-পুরুষ, আইনজীবী, আদালত কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে এবং সরেজমিন পরিদর্শনে এসব তথ্য জানা যায়। আদালত কর্মচারীদের দুর্নীতি, আইনের অপূর্ণতা, প্রতারক মুহুরি, গ্রাম্য দালাল, স্থানীয় পেশকার, কিছু অসাধু আইনজীবী এবং আইন ও অধিকার সম্পর্কে নারীদের ধারণার অপূর্ণতাই আদালতের দুরবস্থার জন্য দায়ী। সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রধান যে সুপারিশগুলো পাওয়া গেছে তা হচ্ছে, নারীদের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত সকল প্রতিবন্ধকতা, পেশকারদের বদলি, আদালত কর্মচারীদের কর্মকান্ড তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে আইন ও বিচার পদ্ধতির বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে সচেনতার বাড়ানো ইত্যাদি। পরিবারের ভাঙন রোধ অথবা দ্রুত বিচারের জন্য পারিবারিক আদালত প্রবর্তন করা হলেও এ আদালতের বিচার পেতে এসে মানুষ আক্ষরিক অর্থে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। সরেজমিন পরিদর্শন,সাক্ষাৎকার ও বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পারিবারিক আদালতে মামলা করতে আসা নারীরা দালাল, মহুরি, পেশকার, পিয়ন,রেকর্ডরুমের কর্মচারী এবং অসাধু আইনজীবী দ্বারা প্রতারিত হচ্ছেন। নীলফামারী জেলার পারিবারিক আদালতে মামলা করতে আসা বেশিরভাগ নারীই অশিক্ষিত ও গরিব। এরা ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকেই দুর্নীতির শিকার। পারিবারিক আদালতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিবাদি অনুপস্থিত থাকে। অথবা বিবাদিরা টাকা-পয়সা খরচ করে মামলার তারিখ পিছায়। এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার। সরকারী-বেসরকারি পর্যায়ে প্রত্যেক জেলায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সংগঠন রয়েছে। এ সংস্থা নারীদের মামলা পরিচালনার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। স্থানীয় আইনজীবীদের নিয়ে এ সংগঠনের একটি কমিট রয়েছে। এ কমিটিকে আরও গতিশীল করা হলে নারীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সহজ হবে।
ন্যায়বিচার কোন মামুলি বিষয় নয়। ন্যাযবিচার নিশ্চিতের জন্য নারীদের সচেতন করে গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদেরকে অর্থনৈতিক ভাবে আত্বনির্ভরশীল করার চেষ্টা করতে হবে। নারীদের ক্ষমতায়িত করা সম্ভব হলে ন্যাযবিচারের রাস্তা প্রসারিত হবে। কেননা জেন্ডার ভিত্বিক নির্যাতন গুলোর সাথে দারিদ্রতার একটি নিবির সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই নারীর ক্ষমতায়ন অপরিহার্য একটি বিষয়। আমরা যদি সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা জয় করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চাই তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নারীদেরকে আত্বনির্ভরশীল করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
জাহাঙ্গীর আলম সরকারঃ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী। ইমেইলঃ advsagar29@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মধ্যযুগীয় নিদর্শন হারুলিয়া জামে মসজিদ

ফিচার ডেস্ক : প্রাচীন ঐতিহ্যের অপূর্ব নিদর্শন নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার হারুলিয়া দক্ষিণপাড়া জামে ...

সুকুমার রায়ের প্রয়াণ আজ

ফিচার ডেস্ক : ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। প্রতিদিনের ...