ব্রেকিং নিউজ
Home | বিবিধ | আইন অপরাধ | সংখ্যালঘুর অধিকার ও রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা

সংখ্যালঘুর অধিকার ও রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা

Advocate Shahanur Islamঅ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম সৈকত : বিশ্বের সকল রাষ্ট্র ও সমাজ জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং ভাষাগতসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সহবস্থানের মাধ্যমে আজ বৈচিত্র্যময় ও সাফল্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিচিত্র পরিস্থিতিতে বসবাস করলেও সাধারণভাবে প্রায়শ তারা বহুবিধ বৈষম্যের শিকার হন। যা তাদের প্রান্তিক অবস্থান থেকে সমাজের বাহিরে ঠেলে দেয়। স্বাধীনতা পুর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে হিন্দু, বৌদ্ধ, ক্রিস্টিয়ান সম্প্রদায়সহ পাহাড়ি ও সমতলে বসবাসরত আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর একের পর এক সংঘটিত হামলা, লুটতরাজ ও অগ্নি সংযোগের ঘটনাগুলো সংখ্যালঘুর অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি সর্বসাধারণের নিকট একটি উদ্বেগের কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

সংখ্যালঘু সম্পর্কে যদিও আন্তর্জাতিকভাবে সর্বসম্মতভাবে গ্রহণযগ্য কোন সংজ্ঞা পাওয়া যায় না, তবুও ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৭/১৩৫ সিদ্ধান্ত মোতাবেক গৃহীত জাতিসংঘ সংখ্যালঘু ঘোষণাপত্রের ধারা ১ অনুযায়ী জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং ভাষাগত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীদের সংখ্যা লঘু হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

এটা প্রায়শই জোড় দিয়ে বলা হয় যে, সংখ্যালঘুর অস্তিত্ব একটি তথ্যগত প্রশ্ন এবং সংখ্যালঘু সংক্রান্ত যে কোন সংজ্ঞায় অবশ্য অবজেকটিভ ফ্যাক্টর অর্থাৎ নৃতাত্ত্বিক,ভাষা বা ধর্মের অস্তিত্ব এবং সাবজেক্টিভ ফ্যাক্টর অর্থাৎ নিজেদের স্বতস্ফূর্তভাবে সংখ্যালঘু হিসেবে দাবী করার মত উভয় বিষয় অন্তর্ভূক্ত হতে হবে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাস এবং জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ভাষাগত বৈচিত্র্যতা একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা প্রণয়নে সবচেয়ে বড় বাঁধা বলে মনে করা হয়।

জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সংখ্যালঘু ঘোষণাপত্রে সাধারণত সংখ্যালঘু শব্দটি  জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক,  ধর্মীয় এবং ভাষাগত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রেই এক বা একাধিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাস লক্ষ্য করা যায়। যাদের নিজস্ব জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় এবং ভাষাগত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য সেদেশের মূল জনগোষ্ঠীর নিকট থেকে পৃথক করে রেখেছে।

সংখ্যালঘুর প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধ ও তাদের মানবাধিকার সুরক্ষা করা সংক্রান্ত জাতিসংঘ সাব কমিশনের সম্মানিত বিশেষ প্রতিবেদক মি. ফ্রান্সেস্কো ক্যাপোটোর্টি ১৯৭৭ সালে সংখ্যালঘুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন যে, সংখ্যালঘু বলতে সে সম্প্রদায়কে বুঝাবে যারা সংখ্যাতাত্ত্বিক দিক দিয়ে একটি রাষ্ট্রের জনসংখ্যার অবশিষ্ট অংশের চেয়ে ন্যূন, একটি আধিপত্যাধীন অবস্থান রয়েছে, যারা জাতিগতভাবে এমন একটি নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় এবং ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ধারণ করে যা তাদের অবশিষ্ট জনসাধারনের নিকট থেকে পার্থক্য নির্দেশ করে এবং তার তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম সংরক্ষণ করে।

কোন সম্প্রদায় সংখ্যালঘু কিনা তা নির্ণয়ে সে সম্প্রদায়ের  আধিপত্যহীন অবস্থানের নিশ্চয়তা অনেক বেশী গুরুত্ব বহণ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সংখ্যাগতভাবে সংখ্যালঘু হয়ে থাকে, কিন্তু সংখ্যাগত ভাবে সংখ্যাগড়িষ্ট হয়েও একটি সম্প্রদায় সংখ্যালঘু হতে পারে যদি সে সম্প্রদায় জনসংখ্যার অপর অংশের আধিপত্যাধীন থাকে। যেমন দক্ষিন আফ্রিকার জাতিবিদ্বেষ শাসনামলে নিগ্রো সম্প্রদায়ের অধিবাসীগণ। কোন কোন ক্ষেত্রে একটি সম্প্রদায় সমগ্র রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্বেও একটি বিশেষ অংশে অপর অংশের আধিপত্যাধীন থাকে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বিশেষ রাজনৈতিক দল বা বিশেষ সেক্সুয়াল বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তি (সমকামী, উভকামী, হিজরা, আন্তকামী) সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলে বিবেচিত হবে কিনা তা প্রায়শ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে থাকে। কারণ যদিও জাতিসংঘ সংখ্যালঘু ঘোষণাপত্রে জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় এবং ভাষাগত সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে যারা জীবনের প্রতি স্তরে বৈষম্যের শিকার হয় তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সমাজের  অন্যান্য অংশ যারা জেন্ডার, ডিজ্যাবিলিটি এবং সেক্সুয়াল বৈশিষ্ট্যের কারনে প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তাদের সংখ্যালঘু হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

মানবাধিকারের মূল স্তম্ভ এবং সংখ্যালঘুর আইনগত সুরক্ষার মূলমন্ত্র বৈষম্যহীনতা ও সমতার নীতি যা সকল আন্তর্জাতিক চুক্তির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সকল আন্তর্জাতিক চুক্তি জাতি, বর্ণ, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা এবং জাতি নির্বিশেষে সবার জন্য মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে। বৈষম্যহীনতা ও সমতার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহনে কার্যকর অংশগ্রহণসহ সকল মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২৭ ধারা এবং আন্তর্জাতিক শিশু সনদের ৩০ ধারায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রে সংখ্যালঘুর অধিকার সংক্রান্ত কিছু মানদন্ড নির্ণয় করেছে এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে সংখ্যালঘুর অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও পদক্ষেপ গ্রহনের গাইডলাইন প্রদান করছে।

সর্বোপরি, আন্তর্জাতিক চুক্তি সমূহের অধীনে প্রদত্ত রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিজেরা অথবা তাদের প্রতিনিধি জাতিসংঘের মানবাধিকার মনিটরিং কার্যক্রমকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে তাদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার কার্যক্রমে কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে ও অন্তর্ভূক্ত হতে পারে।

জাতিসংঘ সংখ্যালঘু অধিকার ঘোষণার ধারা ২ অনুযায়ী- ক) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বাধীন ও স্বতস্ফূর্তভাবে কোনপ্রকার বৈষম্য ছাড়া তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা, ধর্মীয় আচার পালন, ব্যক্তিগত ও নাগরিক জীবনে তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহারের অধিকার রয়েছে; খ) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও নাগরিক জীবনে কার্যকরভাবে অংশগ্রহনের অধিকার রয়েছে; গ) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জাতীয় পর্যায়ে, ক্ষেত্র বিশেষে আঞ্চলিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রয়োজনে জাতীয় আইন প্রণয়নে কার্যকর  অংশগ্রহনের অধিকার রয়েছে; ঘ) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার অধিকার রয়েছে; এবং ঙ) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজেদের মধ্যে, প্রয়োজনে রাষ্ট্রের অন্য যেকোন ব্যক্তি বা অন্যদেশের যেকোন নাগরিকের সংগে বাঁধাহীনভাবে যোগাযোগের অধিকার রয়েছে।

জাতিসংঘ সংখ্যালঘু অধিকার ঘোষণার ধারা ৩ অনুযায়ী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোন প্রকার বৈষম্য ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে এবং সম্প্রদায়ভুক্ত ভাবে সকল প্রকার অধিকার উপভোগ করার অধিকার রয়েছে।

জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় এবং ভাষাগত সংখ্যালঘুর সমস্যা বিষয়ক ইস্যুগুলো সংলাপ ও সহযোগীতায় মাধ্যমে সমাধানের জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬/১৬ সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংখ্যালঘু বিষয়ক ফোরাম গঠন করা হয়। যা সংখ্যালঘুর নির্দিষ্ট সমস্যা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ পরীক্ষার মাধ্যমে সংখ্যালঘুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিবছর বিভিন্ন বেসরকারী মানবাধিকার সংগঠন, সরকার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি দুদিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে।

জাতিসংঘ সংখ্যালঘু অধিকার ঘোষণার ধারা ১ অনুযায়ী রাষ্ট্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রক্ষা ও উন্নয়নে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করে যথাযথভাবে প্রয়োগ করবে।

জাতিসংঘ সংখ্যালঘু অধিকার ঘোষণার ধারা ৪ অনুযায়ী- ক) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা যেন কোন প্রকার বৈষম্য ছাড়া তাদের সকল মানবাধিকার পরিপূর্ণ ও বাঁধাহীনভাবে চর্চা ও উপভোগ করতে পারে রাষ্ট্র সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে; খ) রাষ্ট্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ এবং সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, ঐতিহ্য ও প্রথা উন্নয়নের জন্য অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে; গ) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা শিখার উপর্যুক্ত সুযোগ সৃষ্ট করতে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে; ঘ) রাষ্ট্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য ও সমাজ সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য উপর্যুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে; এবং ঙ) সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যেন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সার্বিক উন্নয়নে পূর্ণ অংশগ্রহণ করতে পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সর্বোপরি, মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের উন্নয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে অন্তর্ভূক্তি ও কার্যকর অংশগ্রহনের মাধ্যমে তাদের বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে এসে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবাধিকার ভিত্তিক উন্নত দেশ গড়া সম্ভব।

বর্তমানে দেশে প্রচলিত আইন সংখ্যালঘু জনগণের অধিকার রক্ষায় যথেষ্ঠ নয়। তাই সংখ্যালঘু জনগনের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানসহ সংখ্যালঘু জাতি গোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন করে তার আলোকে “ সংখ্যালঘু অধিকার আইন” প্রণয়ন করা হোক।

লেখক: মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী; জাস্টিসমেকার্স ফেলো, সুইজারল্যান্ড; একটি শিশুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত; মোবাইল: ০১৭২০৩০৮০৮০; ইমেল: saikotbihr@gmail.com; ব্লগ: www.shahanur.blogspot.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আটোয়ারীতে বিধবা নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক কার্যকলাপ

পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে বিধবা নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকায় এক ...

রাণীশংকৈলে ইয়াবা সহ আটক ১

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় মাদকদ্রব্য ইয়াবা ট্যাবলেট সহ ১জনকে আটক করেছে থানা পুলিশ। ...