Home | ফটো সংবাদ | রাজনীতিতে ফের সংলাপের আবহ

রাজনীতিতে ফের সংলাপের আবহ

স্টাফ রির্পোটার : রাজনীতিতে ফের সংলাপের আবহ দেখা দিয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘কারচুপি’র অভিযোগে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্নির্বাচনের দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও তাদের আবারও সংলাপের আমন্ত্রণ জানাবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। নির্বাচনের আগে তার সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া দল ও জোটগুলোকেই বৈঠকে ডাকবেন তিনি। দিনক্ষণ এখনও ঠিক না হলেও দ্বিতীয় দফা সংলাপের খবর চাউর হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেক দফা ‘চাঙ্গা ভাব’ দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা এটিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আরেকটি ‘চমক’ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

অবশ্য সরকারবিরোধী দল ও জোটসহ আগের সংলাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর সিংহভাগই এ নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তাদের ভাষায়, আগের সংলাপে দেওয়া প্রতিশ্রুতির একটিও বাস্তবায়ন না করায় এবং ‘কারচুপি’র নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতি তাদের ‘অনাস্থা’ ও ‘অবিশ্বাস’ আরও বেড়েছে। এই অবস্থায় সংলাপে অংশগ্রহণ কিংবা এর ফল নিয়ে সংশয় ও সন্দেহ রয়েছে তাদের মধ্যে।

তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন  বলেছেন, তারা সংলাপের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। আমন্ত্রণ পেলে তারা এতে যোগ দেবেন।  তিনি বলেন, কী নিয়ে সংলাপ তা দেখে তারা অংশগ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের অন্য নেতারা সংলাপে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সংলাপের ‘আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র’ পাওয়ার পরই এ বিষয়ে ‘সিদ্ধান্ত’ চূড়ান্ত করবেন বলে মন্তব্য করেছেন তারা। তবে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এ সংলাপের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে।

গত শনিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ সভায় দ্বিতীয় দফায় সংলাপে বসতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহের কথা প্রথম জানা যায়। ওই সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ফের বৈঠকে বসবেন তিনি। আগের সংলাপে অংশ নেওয়া দলগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর এখন সবাইকে নিয়েই দেশ গড়ার কাজ করতে চান তিনি। এ জন্যই সংলাপে অংশ নেওয়া সবাইকে আমন্ত্রণ জানাবেন।

এর একদিন পর গতকাল রোববার দলীয় ফোরামের আরেক যৌথ সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। তিনি জানান, নির্বাচনের আগে সংলাপে অংশ নেওয়া বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় পার্টি, ১৪ দলসহ ৭৫টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সবাইকে গণভবনে ডেকে প্রধানমন্ত্রী ফের সংলাপে বসবেন, তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।

কবে নাগাদ এই সংলাপ হবে সেটি পরিস্কার না করলেও ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, খুব শিগগির তা জানিয়ে দেওয়া হবে। নির্বাচনের আগে যাদের সঙ্গে সংলাপ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী, তাদেরই চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য সংলাপের এজেন্ডা বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডেকে প্রধানমন্ত্রী দেশ ও সরকার পরিচালনায় তাদের সহযোগিতা চাইতে পারেন বলে দল ও সরকারের নীতিনির্ধারণী নেতারা আভাস দিয়েছেন। তারা বলছেন, সরকারবিরোধী দলগুলো ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। সংলাপে প্রধানমন্ত্রী তাদের একসঙ্গে দেশ গড়ার সংগ্রামে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাবেন। এরই মধ্যে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত আট এমপিকে শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলার পর ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন গত বৃহস্পতিবার তার দল গণফোরামের এক আলোচনা সভায় নতুন নির্বাচনের পথ বের করতে ‘জাতীয় সংলাপ’-এর আহ্বান জানিয়েছিলেন। ড. কামাল হোসেনের সংলাপের এ আহ্বান প্রথমে প্রত্যাখ্যান করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তবে এর একদিন পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ফের সংলাপে বসার বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ ব্যক্ত করলেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন আগ্রহকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

আনুষ্ঠানিক চিঠি পেলে সিদ্ধান্ত নেবে ঐক্যফ্রন্ট : এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, কার সঙ্গে কী বিষয় নিয়ে সংলাপ হবে, তার কিছুই জানি না। আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ পেলে দল ও জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করব।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্য শীর্ষ নেতা ও জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগের সংলাপে দেওয়া কথা রক্ষা করেননি। তিনি তখন নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও মামলা করা হবে না বলেছিলেন; কিন্তু তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। নির্বাচনের আগের রাতেই ভোট কেটে গণতন্ত্রের ওপর ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। আমরা কারচুপির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছি। তার পরও চিঠি পেলে সিদ্ধান্ত নেব।

জাতীয় নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না  বলেন, এ বিষয়ে তারা এখনও কিছুই জানেন না। আমন্ত্রণ পেলে বৈঠক করে করণীয় ঠিক করবেন তারা।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী গতকাল  জানান, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের মতো পিঠা উৎসব বা ধন্যবাদ জ্ঞাপনের সংলাপে যেতে তারা রাজি নন। রাতের আঁধারে কারচুপির নির্বাচন বাতিল করে আগামী তিন মাসের মধ্যে নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান তারা। ওই নির্বাচনের জন্য সংলাপ হলে সেই সংলাপে তারা যেতে পারেন।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, সংলাপ কে ডেকেছেন? কেন ডেকেছেন? আমরা নতুন কোনো প্রধানমন্ত্রীকে গ্রহণ করিনি। তার পরও কেউ যদি দায়িত্ব নিয়ে সংলাপ ডেকে থাকেন- কী জন্য ডেকেছেন, তা সুনির্দিষ্ট করে জানাতে হবে। তারপর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

সংলাপকে স্বাগত জানিয়েছে জাতীয় পার্টি : অবশ্য সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ও মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টি এবং আরও কয়েকটি আসন পাওয়া ১৪ দলীয় জোট এবারের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক হয়েছে দাবি করে একে স্বাগত জানিয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নতুন সরকার যাত্রা শুরু করে।

বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের যে উদ্যোগ নিয়েছেন তাকে স্বাগত জানায় জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টি মনে করে, যে কোনো রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ সংলাপ।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ২২ আসন পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হয়ে ভোটে অংশ নেওয়া জাতীয় পার্টি।

সংলাপে সমস্যা সমাধানের কথা বললেও জাতীয় পার্টির দৃষ্টিতে দেশে কোনো সমস্যা রয়েছে কি-না, এ প্রশ্নে জিএম কাদের বলেন, বিএনপি বলছে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। এটিও একটি সমস্যা। সংলাপে বিএনপি তাদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পাবে। সমস্যা থাকলে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় সমাধান করবেন। সংলাপে জাতীয় পার্টি কী দাবি নিয়ে যাবে, তা দলীয় আলোচনায় ঠিক করা হবে বলে জানান দলটির কো-চেয়ারম্যান।

আগে ‘ভুয়া নির্বাচন’ বাতিলের পদক্ষেপ চায় সিপিবি :  বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপ প্রশ্নে সুস্পষ্ট নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী আবারও সংলাপে বসবেন কি বসবেন না তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘ভুয়া ভোট’ ও ‘ভুয়া নির্বাচন’ বাতিলের বিষয়ে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন বা নিচ্ছেন। জনগণও সেটা জানতেই বেশি আগ্রহী।

প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ফের সংলাপে বসার আগ্রহের কথা এমন একটা সময়ে এসেছে, যখন নির্বাচনকে ‘কারচুপি’ ও ‘ভোট ডাকাতির নির্বাচন’ আখ্যা দিয়ে নতুন নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার সরকারবিরোধী দলগুলো। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এই দাবি আদায়ে ‘নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন’-এর ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে। এই জোট থেকে নির্বাচিত আটজন সংসদ সদস্যের শপথ না নেওয়া এবং সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য কয়েকটি দল ও জোটও ভোটে ‘ব্যাপক কারচুপি’র অভিযোগ এনে নির্বাচন ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। নতুন নির্বাচনের দাবি এসেছে এসব দল ও জোট থেকেও।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে ১ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত গণভবনে ৭৫টি দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা। এর মধ্যে বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দু’দফা সংলাপ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তবে ওই সংলাপে কার্যত কোনো সমাধান আসেনি। সংলাপে উত্থাপিত সাত দফার একটিও পূরণ না হলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। অন্যদিকে সংলাপে উত্থাপিত নিজ নিজ দাবিগুলোর বিষয়ে সন্তোষজনক সমাধান ছাড়াই নির্বাচনে যায় বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত আটটি বাম দল, ইসলামী আন্দোলন এবং সরকারবিরোধী অন্য সব দল এবং জোটও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ফকিরহাটে যাত্রীবাহী বাস খাদে; নিহত ৬

বাগেরহাট প্রতিনিধি : বাগেরহাটের ফকিরহাট উপেজলার কাকডাঙ্গা এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ...

টাইগারদের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন

ডেস্ক রিপোর্ট : আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় বাংলাদেশ ...