Home | বিবিধ | আইন অপরাধ | বিশ্বজিৎ হত্যা একটি ‘অশনি সংকেত’

বিশ্বজিৎ হত্যা একটি ‘অশনি সংকেত’

স্টাফ রিপোর্টার :  রাজনৈতিক হাঙ্গামার নামে একজন নিরস্ত্র এবং নিরীহ ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি রাজনৈতিক নেতাদের জন্য ‘অশনি সংকেত’ বলে উল্লেখ করেছেন হাইকোর্ট। আলোচিত বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ের পর্যবেক্ষণে এমনটি বলেছেন হাইকোর্ট। রোববার মামলার রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দস এবং বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর যুগ্ম-বেঞ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির নামে এসব বর্বর হামলার কড়া সমালোচনা করেন।

কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ না করে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ছাত্র রাজনীতি তার গৌরব ধরে রাখতে পারছে না। অস্ত্র এবং মাদক বর্তমান ছাত্র রাজনীতিতে এখন প্রকাশ্য বিষয়। ফলে ছাত্র রাজনীতির নামে তারা চাঁদাবাজি, হত্যা, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

ছাত্র রাজনীতিতে মাদক এবং অস্ত্র বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এতে কোনো কোনো সময় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা হিংস্র, ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে বলেও মন্তব্য করেন আদালত।

রায়ে বলা হয়, কিছু রাজনৈতিক নেতা এ ব্যাপারে প্রণোদনাও দিয়ে থাকেন। তারা মনে করেন, এতে তাদের রাজনৈতিক পরিচিতি আরো সমৃদ্ধ হবে। এমন একটা সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে যে, মিছিলে লোক বাড়ানোর জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয়।

এতে বলা হয়, অনেক সময় আবাসিক শিক্ষার্থীরা হলের সিট ধরে রাখতে মিছিলে বা কর্মসূচিতে আসতে বাধ্য হয়। যদি সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ না করে তবে তাদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এরকম ঘটনাও দেখা গেছে যে, পরীক্ষার হলে নকল করতে না দেওয়ায় দায়িত্বরত শিক্ষককে মারধর করা হয়েছে। এটি ছাত্র রাজনীতির জন্য অশনি সংকেত। কারণ তারাই ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেবে।

আদালত বলেন, বিশ্বজিৎ কোনো রাজনৈতিক দল করতো না। সে ছিল নিরস্ত্র এবং নিরীহ। এই হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত না হলেও হামলাকারীদের উন্মত্ত আক্রমণেই বিশ্বজিতের মৃত্যু হয়েছে।

রায়ে বলা হয়, সাক্ষ্য এবং ভিডিও চিত্রে বিশ্বজিতের শরীরে একাধিক আঘাতের উল্লেখ থাকলেও মামলার সুরতহাল, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে একটি মাত্র আঘাতের কথা এসেছে। তবে প্রতিবেদন দুটিতে আঘাতের স্থান নিয়ে গরমিল রয়েছে। বিশ্বজিতকে কাঠের লাঠি, রড, কিরিচ ও চাপাতি দিয়ে জখম করা হয়েছিল।

আদালত আরো বলেন, এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সুরতহাল প্রতিবেদক চিকিৎসক উপযুক্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি। এভাবে চলতে থাকলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।

ভিডিও চিত্রের বিষয়ে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, কোর্টরুমে ল্যাপটপের মাধ্যমে আমাদেরকে সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিওটি দেখানো হয়েছে। চারটি টিভি চ্যানেলের ভিডিও ফুটেজ দেখে যা কিছু অনুধাবন করা গেছে তা তদন্ত প্রতিবেদন, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আসেনি।

পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বিশ্বজিতের শরীরে একটি কাটা ও দুটি জখমের কথা বলা হয়। আর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে একটি কাটা ও একটি জখমের কথা বলা হয়।

বিশ্বজিৎ দাসের সুরতহাল প্রতিবেদনে সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল হক লিখেন, ‘কোমরের ওপরে পিঠে হালকা ফোলা জখম দেখা যায়। ডান হাতের পাখনার (বগলের) নীচে আনুমানিক তিন ইঞ্চি কাটা রক্তাক্ত জখম ও বাম হাঁটুর নীচে ছেঁড়া জখম রয়েছে।’

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক মাসুদুল রহমান লিখেন, ‘পিঠে ডান কাঁধের (বগলের) নীচে সাড়ে তিন ইঞ্চি চওড়া দেড় ইঞ্চি গভীর একটি ছুরিকাঘাতের জখম এবং বাম হাঁটুর জোড়ায় থেঁতলানো জখম রয়েছে। বগলের নীচে জখমের ফলে তার শরীরের একটি বড় ধমনী কাটা গেছে। শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলো স্বাভাবিক ও ফ্যাকাসে এবং হৃদপিণ্ডের দুটি প্রকোষ্ঠই ছিল খালি। ডান কাঁধের নীচে (বগলে) ও বাম হাঁটুতে জখমের চিহ্ন ছিল।’

সুরতহাল তৈরিকারী পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে পুলিশের একজন ডিআইজিকে আর চিকিৎসকের বিষয়ে স্বাস্থ্য সচিব, ডেন্টাল কাউন্সিল, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে তদন্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এই তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে আইনজীবী মনজিল মোরসেদকে আদালতকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।

তদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদনের কারণে আসামিদের সাজা কমেছে কিনা জানতে চাইলে এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নজিবুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘প্রতিবেদনের জন্য নয়, সাজা কমেছে আসামিদের বয়স, শিক্ষার্থী ও আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতায়।’

‘তবে মিডিয়ায় যেভাবে কোপানোর দৃশ্য দেখানো হয়েছে, তাতে তার শরীরে অনেকগুলো আঘাত থাকার কথা। সেই বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে না থাকায় গাফিলতির বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত’ যোগ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, এই মামলায় নিম্ন আদালতে রফিকুল ইসলাম শাকিল ও রাজন তালুকদারকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এছাড়া নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মাহফুজুর রহমান নাহিদ, এমদাদুল হক এমদাদ, জি এম রাশেদুজ্জামান শাওন এবং মীর মো. নূরে আলম লিমনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কাইয়ুম মিঞা টিপু ও সাইফুল ইসলামে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। এছাড়া নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে এএইচএম কিবরিয়া ও গোলাম মোস্তফাকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।

তবে নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বাকি ১১ আসামি কোনো আপিল না করায় তাদের বিষয়ে মন্তব্য করেননি আদালত। এর ফলে ওইসব আসামির যাবজ্জীবন সাজা বহাল থাকছে।

এই আসামিরা হলেন- ইউনুস আলী, তারিক বিন জোহর তমাল, আলাউদ্দিন, ওবায়দুর কাদের তাহসিন, ইমরান হোসেন, আজিজুর রহমান, আল-আমিন, রফিকুল ইসলাম, মনিরুল হক পাভেল, মোশাররফ হোসেন ও কামরুল হাসান। এদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডও করা হয়।

বিশ্বজিৎ হত্যা নিয়ে সূত্রাপুর থানার পুলিশ বাদী হয়ে করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আইনজীবীদের মিছিল ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া ছাত্রদের একটি মিছিল মুখোমুখি হলে সেখানে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে।

তখন বিশ্বজিৎ দৌড়ে যেতে থাকলে ২০-২৫ জন মিছিলকারী হাতে চাপাতি, রড, লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করে ভিক্টোরিয়া পার্কসংলগ্ন উত্তর পাশের পেট্রলপাম্পের মোড়ে তাকে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়।

প্রাণে বাঁচতে বিশ্বজিৎ পাশের একটি মার্কেটের দোতলায় একটি দন্ত চিকিৎসালয়ের বারান্দায় যান। সেখানেও হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। বিশ্বজিৎ নিচে নেমে আসার পরেও তাকে আঘাত করে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

টেকনাফে কোটি টাকা দামের অবৈধ দুটি ট্রলার জব্দ করেছে বনবিভাগ

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার,১৬ আগস্ট  : কক্সবাজারের টেকনাফ বাহারছড়া ইউনিয়নের মনখালী খাল ...

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল: রায়ের সত্যায়িত কপি চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন

স্টাফ রিপোর্টার :  সংবিধানের সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে আপিল বিভাগের ...