Home | ব্রেকিং নিউজ | বর্ষা- তুমি অপরূপা

বর্ষা- তুমি অপরূপা

ফিচার ডেস্ক : বাংলাদেশে প্রতিটি ঋতুর রয়েছে পৃথক বৈচিত্র্য। অন্যসব দেশ থেকে বাংলাদেশকে ভিন্নভাবে চেনা যায় মূলত ঋতুবৈচিত্র্যের কারণেই। রূপ, রঙ আর ঋতুবৈশিষ্ট্যের ভিন্নতায় প্রতিটি ঋতুই প্রকৃতিকে সাজায় আপন মহিমায়। ঋতুর রানি বর্ষাকাল বাংলাদেশের ঋতুচক্রের দ্বিতীয়। বৃষ্টিস্নাত উজ্জ্বল সবুজের স্নিগ্ধতার পরশে প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্র্যে অপরূপ ঋতু বর্ষা কমবেশি সবারই প্রিয়। বর্ষার একখণ্ড রূপ-বৈচিত্র্য নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন- এস এম মুকুলবর্ষাকাল মানেই মেঘলা আকাশ, রিমঝিমাঝিম বৃষ্টিকবিগুরু যথার্থই বলেছেন, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে/তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ওগো আজ তোরা/যাসনে ঘরের বাহিরে।’ কবির কথাই সত্য, এমন বরষার দিনে মন ঘর থেকে যেন বের হতে চায় না। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি।’ বর্ষাকাল যেন মানুষের হূদয়ে ভাবনার রেশ ছড়ায়। ভারি বর্ষার দিনে মন উদাস করে কতকিছু যে ভাবতে ইচ্ছে করে। ভাবনার মোহাচ্ছন্নতায় যেন নস্টালজিকতা ছড়িয়ে পড়ে হূদয়ে। ঋতুচক্রে আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল। বর্ষাকাল মানেই মেঘকালো আকাশ, রিমঝিম বৃষ্টি আর ভারি বর্ষণ। আষাঢ়-শ্রাবণে বর্ষার ভারি বর্ষণে প্রকৃতি হয়ে ওঠে সবুজ-শ্যামল, সতেজ ও প্রাণবন্ত। টিনের চালে টাপুর-টুপুর বা ঝুমঝুমাঝুম বৃষ্টির শব্দে সৃষ্ট সুর মনকে মুগ্ধ করে। কদম, কেয়ার নয়নাভিরাম রূপের আদলে বর্ষা সাজে আপন মনে। প্রকৃতি দেখে মনে হয়, বর্ষা যেন ময়ূরের পেখম খোলা উচ্ছল নৃত্যের উল্লাস। এ সময় পুকুরের পানিতে, নদী, বিল বা হাওরের পানিতে বৃষ্টি পড়ার শব্দ যেন প্রকৃতি তাল-লয়ের লহর তোলে।

প্রেমের ঋতু বর্ষা

বর্ষা প্রেমের ঋতু কি না- এই নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে বর্ষার বাদলঝরা দিনগুলো যে আমাদের হূদয় ছুঁয়ে যায়— তা অস্বীকারের উপায় নেই। আর এ কারণেই বর্ষাকে কেউ কেউ প্রেমের ঋতু বলেছেন। প্রকৃত অর্থে বৃষ্টির দিন মানুষকে ভাবুক করে তোলে। বর্ষা কবিদের জন্যও বিশেষ একটি ঋতু। বর্ষা নিয়ে কবিতা লিখেননি এমন কবি ক’জনই-বা আছে। তাই বাঙালি কবিরা বর্ষায় কাব্য ভাবনায় নিমগ্ন থাকেন। শুধু প্রকৃতি নয়, বর্ষা বৈচিত্র্য আনে মানুষের হূদয়ে-মননে। বর্ষা যেন রসিক ঋতুও। বেরসিক মানুষটিকেও বর্ষা-বাদলের দিনে যেন কবি হতে প্ররোচিত করে। ‘ভারি বরষণে মন ভাবিতে যে চায়— হূদয় যারে কাছে পেতে চায়।’ বর্ষায় প্রেমিক-প্রেমিকার মন উতলা হয়; কাছে পেতে চায় দুজন দুজনায়। বৃষ্টিমুখর দিনে প্রেমিক-প্রেমিকা পত্র বিনিময় করতে ভালোবাসে। আধুনিক যুগে প্রেমিক-প্রেমিকারা বৃষ্টির দিনে মোবাইল ফোনে কথা বলে, এসএমএস পাঠায়। আবার ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে চিরকুট পাঠায়। সুযোগ বুঝে ডেটিংয়ে বের হয়। সত্যিই, এমন বাদল দিনে আহা মন কী যে চায় বুঝিবারে দায়…।

গ্রামীণ জীবনে বর্ষার স্মৃতি

বর্ষার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় গ্রামীণ জীবনে। গ্রামীণ জীবনে বর্ষাকাল যেমন উপভোগ্য, তেমনি বিড়ম্বনারও। কারণ বর্ষাকালে গ্রামের উঠান, রাস্তাঘাট কাদায় পরিপূর্ণ থাকে। টানা ভারি বর্ষণে ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এমনো হয়, কয়েক দিনের বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশের কারণে সূর্যের মুখ দেখা যায় না। বর্ষার আকাশ সহসা ফর্সা হয় না। যখন-তখন এই মেঘ, এই বৃষ্টি। তারপরও ছেলেবেলায় গ্রামে বর্ষাকালে আনন্দের অন্ত ছিল না। দলবেঁধে বৃষ্টিতে ভিজে গোসল করতাম। কলাগাছে চড়ে সাঁতরে বেড়াতাম। সাঁকো থেকে লাফ দিয়ে পানিতে পড়তাম। ঝুম বৃষ্টিতে স্কুল থেকে ফেরার পথে পলিথিনে বই-খাতা মুড়িয়ে হইহল্লা করতে করতে বাড়ি ফিরতাম। আর বড় বাতাবি লেবু (জাম্বুরা) দিয়ে মাঠে ফুটবল খেলার আনন্দের দিনগুলো আজ যেন শুধুই স্মৃতি। নিচু স্থানে পানির সমান্তরাল কাঠি পুঁতে রেখে সকালে গিয়ে দেখতাম কতটুকু পানি বাড়ল। বাড়ির আঙিনায় জমে থাকা পানিতে কাগজের নৌকা ভাসাতাম। কলার ভেলায় বসে ছিপ বড়শি দিয়ে ট্যাংরা, পুঁটি আর টাকি মাছ ধরার আনন্দ স্মৃতিতে এখনো অমলিন। বর্ষায় গ্রামবাংলায় অন্যতম বাহন ছিল নৌকা। দাড়টানা পালতোলা নৌকার চিরচেনা রূপ এখনো কদাচিৎ গ্রামের নদীতে চোখে পড়ে। গ্রাম কিংবা শহরে বর্ষায় বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষাকারী হিসেবে ব্যবহূত হয় ছাতা। খেটে খাওয়া মানুষ পলিথিনে শরীর আবৃত করে বৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করে। তবে প্রাচীন গ্রাম-বাংলায় গোলপাতার তৈরি মাথাল ব্যবহার হতো। বর্ষায় গ্রাম-বাংলায় বিয়ের রীতি বহু পুরনো। যাতায়াত সুবিধা ও জমিজমার তেমন কোনো কাজ না থাকায় বর্ষাকালকেই বিয়ের জন্য উপযুক্ত সময় মনে করা হতো।

হাওর, নদী, খাল-বিল জলে টইটম্বুর

বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিধারায় গ্রাম-বাংলার নদী, খাল, বিল, পুকুর ও হাওর এখন পানিতে ভরপুর। দেশের কোথাও না কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। আর প্রতিদিন পানি বাড়ছে। কোথাও পুকুরের পাড় ডুবে উপচে পড়ছে পানি। পুকুরের মাছ সুযোগ পেলেই ছুটে যাচ্ছে মুক্ত জলাশয়ে। বর্ষার অথৈ পানিতে চারপাশ যখন ভরে ওঠে তখন কোথাও কোথাও খাল-বিল-নদী পৃথক করে বোঝার উপায় থাকে না।  তবে বর্ষায় অথৈ সাগরের মতো দেশের সর্ববৃহৎ বিশাল জলাধার পানিতে টইটম্বুর থাকে হাওর। বর্ষার মৌসুমে হাওরে নৌকা ছাড়া চলাচলে আর কোনো অবলম্বন নেই। বর্ষায় হাওরাঞ্চলে ছোট ছোট নদী, খাল-নালা আর বিস্তীর্ণ বিল মিলিয়ে দেখা যায় বিশাল হাওর। বর্ষার দিগন্তবিস্তৃত অথৈ জল, উদ্দাম ঢেউয়ের অবিরাম মাতামাতি আর উড়ন্ত বাতাস যেকোনো পর্যটকের মন উদাস করে দেয়। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি জেলা নিয়ে হাওরাঞ্চল। সৌন্দর্যের পাশাপাশি হাওরগুলোর নামও মনোমুগ্ধকর— টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, ডিবির হাওর, শনির হাওর, টগার হাওর, মাটিয়ান হাওর, দেখার হাওর, হালির হাওর, কড়চা হাওর, চন্দ্রসোনার থাল হাওর প্রভৃতি।

বর্ষার আতঙ্ক বন্যা

নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বন্যাপ্রবণও। প্রায় প্রতিবছরই দেশের কোথাও না কোথাও বন্যা দেখা দেয়। বন্যার সংজ্ঞায় বলা হয়, বর্ষাকালে যখন নদী, খাল, বিল, হাওর ও নিচু এলাকা ছাড়িয়ে সব জনপদ পানিতে প্লাবিত হয়, তখন ডুবে যায় ফসল, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট প্রভৃতি। বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় আর বৃষ্টির কারণে পানির প্লাবন বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে ১,৮৭,০০০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার নদীপ্রবাহ সৃষ্টি হয় বৃষ্টিজনিত কারণে। প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ২৬,০০০ বর্গ কিমি অঞ্চল, অর্থাৎ কমবেশি ১৮ শতাংশ ভূখণ্ড বন্যাকবলিত হয়। যদি ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়, তাহলে সারা  দেশের ৫৫ শতাংশের অধিক ভূখণ্ড বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। বন্যার কারণে ফসল এবং রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশেষত খেটে খাওয়া শ্রমজীবীদের কর্মস্থানে স্থবিরতা দেখা দেয়। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের বন্যায় প্রায় ১০,৩৬০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল প্লাবিত হলে মানুষ ও গবাদি সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি এবং লাখ লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ১৯৮৭ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বন্যায় প্রায় ৫৭,৩০০ বর্গ কিমি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৮৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বন্যায় প্রায় ৮২,০০০ বর্গ কিমি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৯৩ সালে প্রবল বৃষ্টিতে ২৮ জেলা বন্যাকবলিত হলে হাজার হাজার হেক্টর জমির শস্য পানিতে তলিয়ে যায়। ১৯৯৮ সালের আগস্ট মাসে ৬৮ শতাংশ এলাকার ১ লাখ ২৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়। বন্যার ব্যাপ্তি অনুযায়ী এটি ১৯৮৮ সালের বন্যার সঙ্গে তুলনীয়। ২০১৬ সালে বন্যায় দেশের উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের মোট ১৯টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্ষায় নৌকায় নাইয়রি

গ্রাম-বাংলার চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী প্রতিটি পরিবারের যে কন্যাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে বর্ষাকাল এবং হেমন্ত বা শীতকালে বাবার বাড়িতে আনা হয়। এই রীতিকে গ্রামীণ ভাষায় নাইয়র বলা হয়। নাইয়রের সঙ্গে নারী জীবনের আবেগের সম্পর্কটি খুবই গভীর। বিয়ের পর নদীমাতৃক গ্রামবাংলায় একসময় নদীপথে নৌকায় চড়ে বাবার বাড়িতে নাইয়রি হয়ে আসার অপেক্ষায় থাকতেন বিবাহিত মেয়েরা। সেই অপেক্ষার সময়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল বর্ষাকাল। বর্ষাকালের আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিতে গ্রাম-বাংলার নারী মনের ব্যাকুলতাকে গানের সুরে বেঁধেছেন উকিল মুন্সী। তার বিখ্যাত সেই গান ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে’ ভাটি বাংলাসহ আপামর গ্রামীণ মানুষের হূদয়ের আকুলতাকে আজো আলোড়িত করে। সেই গানে তিনি লিখেছেন-‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে/পুবালি বাতাসে/ বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি/ আমারনি কেউ আসে রে/ যেদিন হইতে নয়া পানি আইলো/ বাড়ির ঘাটে সখী রে/ অভাগিনীর মনে কত শত কথা ওঠে রে।/ গাঙে দিয়া যায় রে কত নায়-নাইয়রির/ নৌকা সখী রে…….’

 

[প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিটুডে২৪ ডট কম এর অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-bdtoday24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

চট্টগ্রামে ৩ ছিনতাইকারি গ্রেফতার

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে মাইক্রোবাসে তুলে জিম্মি ...

পার্বত্য অঞ্চল হবে সম্পদ শান্তিতে সমৃদ্ধ: পরিকল্পনামন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার: পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্প্রীতি, সম্ভাবনা ও উন্নয়নের বিষয়টি বেশ জটিল, তবে ...