ব্রেকিং নিউজ
Home | জাতীয় | প্রত্যেক ডিভোর্সে (তালাক) বাচ্চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় :হাইকোর্ট

প্রত্যেক ডিভোর্সে (তালাক) বাচ্চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় :হাইকোর্ট

স্টাফ রিপোর্টার : প্রত্যেক ডিভোর্সে (তালাক) বাচ্চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর তাদের সবার অনুভূতিও একইরকম বলে মন্তব্য করে বিচ্ছেদ হওয়া মা-বাবাকে একসঙ্গে কাছে পেতে দুই শিশু ধ্রুব ও লুব্ধ আদালতে যে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন সেটাকে এই সমাজের প্রতি একটা বার্তা বলেই অভিহিত করেছেন হাইকোর্ট।

বুধবার (০৪ জুলাই) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন।

২০০২ সালে রাজশাহীর মেয়ে কামরুন্নাহার মল্লিকা এবং মাগুরার ছেলে মেহেদী হাসান প্রেম করে বিয়ে করেন। মল্লিকা পেশায় স্কুল শিক্ষিকা আর মেহেদী বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। দাম্পত্যজীবনে তারা ধ্রুব (১২) ও লুব্ধ (৯) নামের দুই সন্তানের বাবা-মা।

এক পর্যায়ে দম্পতির মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। গত বছরের মে মাসে নোটিশের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করেন তারা। তবে এর কিছুদিন আগে দুই সন্তানকে মাগুরায় গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেন মেহেদী।

বোনের তত্ত্বাবধানে মাগুরা জেলা শহরের একটি স্কুলে সন্তানদের ভর্তি করিয়ে দেন মেহেদী। এর মধ্যে দুই সন্তানের দেখা পাননি মা মল্লিকা।

এক পর্যায়ে দুই সন্তানকে নিজ হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন মল্লিকা। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে শিশু দুটিকে ২৫ জুন হাইকোর্টে হাজির করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও শিশু দুটির বাবাকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে সন্তানদের কেন তাদের মায়ের হেফাজতে দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

আদেশ অনুযায়ী শিশু দুটিকে ২৫ জুন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে আনা হয়। এ সময় শিশু দুটির বাবা-মা, মামা, নানী ও ফুফুসহ আত্মীয়-স্বজনের আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এরপর শুরু হয় শুনানি। এক পর্যায়ে শিশু দুটির বক্তব্য শুনতে চান আদালত।

দীর্ঘদিন পর মুখোমুখি হওয়ায় সন্তান ও মায়ের কান্নায় এক হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিচারপতি, আইনজীবী ও উপস্থিত সাংবাদিকদেরও চোখে জল নেমে আসে। এক পর্যায়ে আদালতের জিজ্ঞাসার জবাবে বড় ছেলে বললেন-‘আমরা আর কিছু চাই না। বাবা-মাকে একত্রে দেখতে চাই।’

ঠিক ওই সময় বড় ছেলে ধ্রুব আদালতে উপস্থিত তার বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে বলতে থাকে, ‘বাবা তুমি এসো, তুমি আম্মুকে স্যরি বলো। আমরা তোমাকে ও আম্মুকে নিয়ে একসাথে থাকতে চাই!’

এক পর্যায়ে এগিয়ে আসেন বাবা মেহেদী হাসান। সেসময় হাইকোর্ট কক্ষে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়! দুই সন্তান ও বাবা-মায়ের কান্নার দৃশ্য দেখে আদালতের বিচারক-আইনজীবী ও সাংবাদিকদের চোখে জল আসে। সবাই কাঁদতে থাকেন।

বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক মা-বাবাকে উদ্দেশ্য করে তখন বলেন, এই দৃশ্য দেখেও কি আপনাদের মন গলে না? আপনারা কি এই ছোট্ট সন্তানদের জন্য নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতে পারবেন না? সামনে তাকিয়ে দেখেন আপনাদের এই দৃশ্য দেখে সকলের চোখেই পানি আসছে।

ওইসময় আদালতে উভয় পক্ষের আইনজীবীসহ অন্যান্য আইনজীবীরা দাঁড়িয়ে সমস্বরে সন্তানদের বিষয়টি চিন্তা করতে বাবা-মার প্রতি আহবান জানান।

সেই সঙ্গে এই দুই সন্তানদের চাওয়া অনুযায়ী তাদের বাবা-মার দাম্পত্য জীবন যাতে বজায় থাকে এমন একটি আদেশের জন্য আদালতের প্রতি আহবান জানান।

এক পর্যায়ে আদালত ওই বাবা-মা এবং তাদের আইনজীবীদের খাস কামরায় ডেকে নেন। পরবর্তীতে এজলাসে এসে হাইকোর্ট বেঞ্চ তার আদেশে বলেন, আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত শিশু দুটি তাদের মায়ের হেফাজতে থাকবে। আর এই সময়ে পিতা শিশু দুটিকে দেখতে যেতে পারবে।

এরপর আদালত এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য ৪ জুলাই দিন ধার্য করেন। সে অনুযায়ী বুধবার (০৪ জুলাই) আবার দুই সন্তান নিয়ে হাইকোর্টে এসে উপস্থিত হন বাবা-মা।

আদালতে মেহেদী হাসানের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী তাপস কান্তি বল। আর মল্লিকার পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস ও এ কে এম রিয়াদ সলিমুল্লাহ।

আদালত বলেন, ‘পরিস্থিতির কি কোনো উন্নতি হয়েছে?’

তখন তাপস কান্তি বলেন, ‘হ্যাঁ, কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মা ছুটি নিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরেছেন। বাবাও বাচ্চাদের সময় দিয়েছেন। কিন্তু এর মধ্যে একটি সমস্যাও দেখা দিয়েছে। ছোট বাচ্চাটি তার বাবাকে মায়ের বাসায় রাতে থেকে যাওয়ার আবদার জানালে বাবা রাজি হলেও মা রাজি হননি। রাত একটায় বৃষ্টির মধ্যে বাবাকে বের হয়ে যেতে হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পারিবারিক সমস্যার কারণে ব্যাংকে অভিযোগ দেওয়ার কারণে ২০১৬ সালে ডিসেম্বরে বাবার চাকরি চলে যায়।

পারিবারিক এই বিষয়টি স্মরণ করে দিয়ে এ সময় আদালত বলেন, ‘এ ঘটনায় মিডিয়ায় কিভাবে গিয়েছে দেখেছেন? জনমত সেটাকে কিভাবে দেখেছেন। এটা একটি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তখন তাপস কান্তি বলেন, ‘বাবা শিশুদের কাছে সারেন্ডার করেছে। বাচ্চারা যেভোবে চাইবেন বাবা সেভাবে করবেন।’আদালত বলেন, ‘এটাকে কি পরিস্থিতির উন্নতি মনে করেন?’

তাপস কান্তি বলেন, ‘কিছু তো উন্নতি হয়েছে।’পরে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘এটা পুরোপুরি পারিবারিক ইস্যু। সুতরাং দুই জনের মধ্যেই সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য আরো সময় লাগবে।’

তখন আদালত বলেন, ‘ঠিক। এটা তো রাতারাতি উন্নতি হবে না।’

রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘বাচ্চা দুটি ইতিমধ্যে ঢাকায় স্কুলে ভর্তি হয়েছে। বাচ্চারা খুশি প্রতিদিন মা স্কুলে আনা নেওয়া করছেন।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘ঠিক আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাচ্চাদের অভিপ্রায় উপেক্ষা করে স্কুলে ভর্তি করলে হয় না।’

তখন রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘এই ঘটনা গণমাধ্যমে আসার পর যেখানে গিয়েছে সেখানে বলেছে তোমরা পূন্যের কাজ করেছো। আদালতের প্রতি মানুষের উচ্চাশা বেড়ে গেছে। কোর্ট সমঝোতার জন্য সময় দিয়েছে। এটা সর্বমহলে বার্তা দিয়েছে। শিশুদের কল্যাণ বিবেচনায় পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে উভয়পক্ষকে মনে রাখতে হবে, আদালতের নমনীয়তায় যদি তারা অন্য কিছু ভেবে থাকেন তাহলে সেটা ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে আদালতের হাত খাটো না। বাচ্চাদের মঙ্গল চিন্তা করে আদালত যে কোনো আদেশ দিতে পারেন।’

তখন আদালত বলেন, ‘শুধু এ বিষয়না, প্রত্যেক ডিভোর্সে বাচ্চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদের সবাইর অনুভূতি একই রকম। হয়তো এ দুটি বাচ্চা আজকে আমাদের সাথে অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে। সারা দেশের ডিভোর্স দম্পতির সব বাচ্চারই অনুভূতি এক, তারা সেটা বলতে পারে না। এ বাবা মা শুনলেও অন্যরা বাচ্চাদের অনুভূতি কানে নিচ্ছে না।’

এ সময় তাপস কান্তি বলেন, ‘বাচ্চারা যদি চায় বাবাকে যেন বাসায় থাকায় অনুমতি দেওয়া হয়। প্রয়োজনে ড্রয়িং রুমে থাকবে।’

তখন আদালত বলেন, ‘অপেক্ষা করুন, সমঝোতা হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

এরপর আদালত শিশু ও বাবা-মা ‍দুজনের কথা শোনেন।

আদালত শিশুদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমরা কে কোন দল সমর্থন করো। জবাবে বড় শিশু বলে, ব্রাজিল। ছোটটি বলে- আমি আর্জেন্টিনা।’

বাবা-মাকে উদ্দেশ্যে করে আদালত বলেন, ‘আপনারা দুইজনই শিক্ষিত, সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী। নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন মানুষের কাছে কী বার্তা গেছে? আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই।’

তখন তাপস কান্তি বলেন, ‘মা ছুটি নিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরছে। বাবারও ইচ্ছা শিশুদের নিয়ে ঘুরতে।’

আদালত বলেন, ‘বাবাও ঘুরতে পারবেন।’

এরপর আদালত পরবর্তী আদেশের জন্য ১ আগস্ট দিন ঠিক করেন। এ সময় আদালত বলেন, সমঝোতা প্রক্রিয়ার উন্নতি হয়েছে। আরও উন্নতির জন্য দুই পক্ষই সময় চেয়েছেন। সময় দেওয়া হলো।

আদেশের পরে আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আজকে আদালতে বাবা-মাসহ বাচ্চা দুটি উপস্থিত ছিলেন। আদালত আমাদের কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন ওনাদের দুজনের পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি কত দূর। আমরা বলেছি যে, আর একটু সময় যদি আপনারা দেন। তাহলে আমি সন্তানের মায়ের পক্ষ থেকে বলেছি, মা ওপেন আছেন। বাবার পক্ষ থেকে তার আইনজীবীও বলেছেন, সন্তানের ভালোর জন্য তিনি মেনে নেবেন। আমাদের এ বক্তব্য শুনে আদালত আগামী ১ আগস্ট তারিখ রেখেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার : তিন দিনের বাংলাদেশ সফরের শেষ দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ...

ফকিরহাটে ঐতিহ্যবাহী শীতলা মন্দিরে রথ যাত্রা উৎসব শুরু

সুমন কর্মকার : সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা। ...