Home | শিল্প সাহিত্য | গদ্য | পোড়া স্বপ্নের গল্প

পোড়া স্বপ্নের গল্প

moshiur rahman shantoমশিউর রহমান শান্ত : 

মানুষ মরে গেলে কি হয়??? পচে যায় নাকি গলে যায় ??? নাকি শুধু দেহটাই আলাদা হয়ে যায়??? আর আত্মা ঠিক ঘুরতে থাকে আগের মতোই ??? জানি না। শুধু আমি কেন কেউই জানে না হয় তো। আমি শুয়ে শুয়ে এখন সেটাই ভাবছি। ভাবনা ছাড়া অন্য কিছু করার নেই। করার থাকবেই বা কিভাবে চাকরীটা যে চলে গেল!!! মা খুব খুশী হয়েছিল চাকরি পাওয়ার পর। আহামরি কোন চাকরি না। খুশীতে বাকবাকুম করার মত তো একেবারেই কিছুই ছিল না। কিন্তু মাকে কে বুঝাবে??? অর্থনীতিক ভাবে ছোট পরিবারগুলোর স্বপ্ন কিংবা খুশীগুলো কেমন যেন ছোট ছোট হয়। না ভুল বললাম। খুশী ছোট হয় না, ছোট হয় খুশী হবার কারণ গুলো। আর তাই তো মা খুশীতে আধখানা হয়ে ভেবেই বসল বড় ছেলের একটা গতি হয়েই গেল। এখন ছোট ছেলেটার যদি কিছুদিন পর চাকরি হয়ে যায় তাহলেই দায়িত্ব শেষ। যদিও ছোট ছেলের চাকরি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক দূরে। কারণ সে মাত্র ক্লাস সেভেনে। তবে বড় ছেলের তুলনায় ছোট ছেলেটা আসলেই খুব কষ্ট করে। সেই কষ্টগুলো দেখে আমারও কষ্ট হয়। হাজার হোক আমারই তো ছোট ভাই। তাই যখন দেখি ছেলেটা ছেড়া একটা জুতা পড়ে,কিংবা ইস্ত্রি ছাড়া শার্ট পড়ে হাসিমুখে স্কুলে যাচ্ছে তখন ইচ্ছে করে একবার জড়িয়ে ধরি। এক ইদ ছাড়া তেমন একটা কাপড় কেনা হয় না। তবুও যখন দেখি,কোন আফসোস কিংবা রাগের বিন্দু মাত্র রেশ নেই তখন কেন জানি মায়া হয়। ইচ্ছে করে দেই না হয় একটু মাথায় হাত বুলিয়ে। কেন জানি ধরতে পারিনা। আমার ভালোবাসা হয় তো বোবা তাই মুখে আসার আগেই শব্দগুলো হারিয়ে যায়। শব্দ হারিয়ে যায়… হা হা হা…বাহ শব্দগুলো কেমন যেন ফিল্মি লাগছে। মনে হচ্ছে কবি হয়ে গেছি। কবি হতে পারলেও খারাপ হত না। যা দেখছি তা খাতায় লিখে ফেলতাম। কিন্তু সেই সুযোগই বা কোথায় হল???? ক্লাস টেনে উঠার পরই সব শেষ। তীরে এসে তরী ডুবে গেল। থাক সেইসব কথা। জীবন যে খেলা খেলে দিয়েছে তা নিয়ে আর কি বা বলার আছে??? তবে একটা ব্যাপার খুব খারাপ লাগত যখন দেখতাম বড় বড় মানুষগুলো গলা শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। কি অদ্ভুত এই দুনিয়ার হিসেব নিকেশ। যার অনেক বেশী আছে সেই অনেক বেশী হা-হুতাশ করে। তবে একদিন খুব কষ্ট লাগল। বড় খালু একদম বড় গলায় মাকে বলল, জীবনেও তোর পোলাগো পড়া লেখা হইব না। মা অনেক বেশী কাঁদল সেদিন। কি নিয়ে যে ঝগড়া লেগেছিল সেটা এখন মনে করতে পারছি না। কাঁদতে কাঁদতে বাসায় গিয়ে আমাকে বলল, রক্ত বেঁচে হলেও তোদের আমি পড়াশোনা করাব। মায়ের রক্ত বিক্রির দরকার হয়নি তার আগেই আমার লেখা পড়া শেষ। ঐ যে বললাম না ক্লাস টেন। বাংলা সিনেমা হলে হয় তো ভিন্ন কথা ছিল। ঠিকই বিশ বছর পর মানুষের মত মানুষ হয়ে বড় খালুর দিকে তাকিয়ে বলা যেত মানুষ হয়ে এসেছি। আসলে মানুষ হওয়ার জন্য টাকা থাকাটাও খুব দরকার। এখনো অনেক কিছু চোখে ভাসে। স্কুলের কাহিনীটাই ধরা যাক। স্কুল ছুটির পর আমি বাসায় ফিরতাম লেগুনা গাড়িতে। মুড়ির টিনের মত সেই গাড়িগুলোতে আসতে কি যে কষ্ট হত। সবচাইতে বেশী কষ্ট হত তখন যখন স্কুল ছুটির পরে বিরিয়ানির দোকানের সামনে দিয়ে লেগুনা স্ট্যান্ডে যেতাম। ক্ষুধা পেটে ঐ বিরিয়ানির দোকানের বিরিয়ানির গন্ধ নাকে লাগলে কেমন লাগে সেটা আসলে কাউকে বলে বোঝানো সম্ভব না। আর সম্ভব কি অসম্ভব সেটা বড় কথা না। বড় কথা হচ্ছে এইসব কথা কেন জানি কখনোই বলা হয়ে উঠে না। কখনো কেন জানি এই কষ্টগুলো অন্য কারো মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়নি। হয় তো বা বলার মানুষ কিংবা ইচ্ছে কোনটাই আসলে ছিল না। হুম ইচ্ছে, সবচাইতে বড় কথা ইচ্ছেই ছিল না। একেবারে যে কেউকে কখনো বলিনি সেটা বললে ভুল হবে। মোবাইল কেনার পর নতুন নতুন কথা বলতে খুব ভালো লাগত। কলেজে পড়ুয়া এক মেয়ের সাথে ভাবও হয়েছিল। নাম শিরোপা। কি এমন হল কিছুই বুঝলাম না। না দেখা, না শোনা, তারে মনের সব কষ্টের কথা বলে দিলাম। আর যা হবার তাই হল। দুইদিন পর আমার ফোন আর ধরে না। আসলে করুণা জিনিসটা খুব খারাপ। মেয়েটা করুণা না করে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল তাই মনে মনে ধন্যবাদই দিয়েছিলাম। কোন কথা থেকে কোন কথায় চলে এসেছি। অতীতের কথা না বলে বর্তমান এর কথা বলা যাক। কারওয়ান বাজারে যে দোকানে আমি চাকরি করতাম সেটা এলুমিনিয়াম গ্লাসের। মালিক ভালো না হলেও বেতন ভালোই। সাত হাজার টাকা। অনেকের কাছে এটা কম হলেও আমার কাছে অনেক। যদিও নবাবপুর থেকে প্রতিদিন বাসে চড়ে এখানে এসে নামার পর মনে হত আমি আমার মধ্যে নেই। তারপরেও মাস শেষে টাকা পাওয়ার পর সব ভুলেই যেতাম। প্রতিদিনের অপমানের কথাগুলোও মাটি চাপা পড়ে যেত। সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে ছোট ভাইয়ের স্কুলের জুতা কিনে না দিতে পারলেও বেতন তো দেওয়া হত। মা এতেই খুশী কারণ এখন নুন আনতেই তার পান্তা ফুরায়। ছোট ভাইয়ের স্কুলের বেতন কিভাবে মেটাবেন। চাকরি যাওয়ার কোন কারণ ছিল না। আজ সকালে প্রতিদিনের মত আসলাম। আসার পর গরম মাথায় ৩ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে মালিক বললেন, কাল থেকে আর আসবি না। আমার লাভের চাইতে কর্মচারী বেশী হয়ে গেছে। লাভের গুড় সব তোরাই খাচ্ছিস। আমার এত মানুষের দরকার নেই। বাসা সামনে হলে হেটেই চলে আসতাম। মাথার উপর দিয়ে বলতে গেলে ধোঁয়াই বের হচ্ছিল। হাজার হলেও এই সাত হাজার টাকা দিয়ে আমার পরিবার মানে মা আর ভাই কিছুটা হলেও তো শান্তিতে ছিল। বাবা তো নাই। সেই ছোটবেলায় নিজের মত করে চলে গেছে। তাই উনার কথা বলারও নাই। তবে আফসোস হচ্ছে। কেন যে চাকরি হারানোর পর বাসে উঠতে গেলাম। অবশ্য বাসে উঠা ছাড়া আমার মত নিম্ন মধ্যবিত্তদের আর কোন গতিও নেই। প্রতিদিন নিউজ আর নিউজ পেট্রোল বোমায় এতজন দগ্ধ, অতজন দগ্ধ। মরে শুধু সাধারণ মানুষগুলোই। আমাদের দোকানের মালিক বলছিল, আরে বাবা বোমা পড়লে ফাটতেও তো সময় লাগে তোরা নাইমা গেলেই পারিস, সব গাধা প্যাসেঞ্জার দিয়া দুনিয়া ভরা। আমারও তাই মনে হত। মনে হত এই আর এমন কি? কিন্তু আজ যখন চাকরি হারানোর পর বাসে উঠলাম। বেশী না শাহবাগে আসলাম তখন হটাত করেই একটা শব্দ হল আর চোখ বন্ধ হয়ে গেল। ঠিক চোখ বন্ধ হল কিনা বুঝলাম না। সবকিছুই কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেল। বাস থেকে নামা তো দূরের কথা সিট থেকে দাঁড়ানোর টাইমও পেলাম না। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ঝলসে গেল। শুধু মাত্র দেখলাম একটা আগুনের শিখা। পিছনের সিটে ছিলাম। হটাত মনে হল পুরো শরীর কিংবা মস্তিষ্ক অবশ হয়ে গেছে। একটু পরেই টের পেলাম গরম কিছু একটা আমার শরীরে আটকে আছে। গরম তেল দিলে বুঝি এমন লাগে। তারপর মনে হল না ঠিক সেরকম  না। আমাকে মনে হয় গরম কোন গুহায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। সামনে একটা মহিলার কান্নার শব্দ পেলাম। চিৎকার করে বলছে শুষী কই ? আমার শুষী কই ??? মনে হয় মেয়েকে ডাকছে। কি অদ্ভুত এত আগুনের মধ্যেও তার মাথায় গেঁথে গেছে যে মেয়েকে বাঁচাতে হবে। আর অল্প কয়েক সেকেন্ড সেখানেই ছিলাম। আর সেখানেই পুড়ে ছাই। চোখগুলো যখন পুড়ছিল তখনো আমার মাথা একটু একটু কাজ করছিল। কিন্তু তার পর আর কিছুই মনে নেই। তবে না একদল মানুষ আমার এই পোড়া লাশকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে এসেছে। ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার এর কারণে ইমারজেন্সি মর্গতে এখন আমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মা আর ছোটভাইটা মর্গের বাইরে দাড়িয়ে কাঁদছে। খুব কাঁদছে দুজন। ছোট ভাইটার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। ঠিক করেছিলাম এবার বেতন পেলে ওকে নিয়ে বাইরে খাব। একদিন তো বাইরে খাবার দেখে যেভাবে তাকিয়েছিল দেখেই বুঝেছিলাম খিদায় ওর জান তেজপাতা। খিদা আসলেই বড্ড খারাপ জিনিস। তখনই ঠিক করলাম ওরে নিয়ে একদিন বাইরে খাব। সেটা ও শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল না। একজন সাংবাদিককে দেখলাম তাদের কান্নার ছবিও তুলল। কপাল ভালো মাকে কিংবা ছোট ভাইটাকে বলা হয়নি যে আমি শেষ হবার আগেই চাকরি শেষ হয়েছিল,কিংবা প্রতিদিন বাসে করা ৪ ঘণ্টা জার্নি করার পর ৮ ঘণ্টা চাকরি করে সে আগেই মারা গিয়েছিল, কিংবা আরও অনেক না বলা কষ্টগুলো। তার বড় ছেলে মনে এত বেশী কষ্ট নিয়ে মারা গেছে এটা ভাবতে তার হয় তো আরও বেশী কষ্ট হত। ভালোই হয়েছে বলা হয়নি। এখন আর কিছু ভাবতে ভালো লাগছে না। ভাবনার ক্ষমতাও শেষ। আমার লাশ মর্গ থেকে বের করা হচ্ছে। একজনকে দেখলাম নাকে কাপড় ধরে আছে। আমার লাশ থেকে বাজে গন্ধ বের হচ্ছে বুঝতে পারছি। কি আর করা!!! জীবিতদের যেখানে কিছু করার নেই সেখানে এই মৃত আমি কি বা করতে পারি???? চোখগুলোর সাথে স্বপ্নগুলোও পুড়ে গেল। কত স্বপ্ন দেখেছিলাম তা এখন বলে শেষও করা যাবে না। এখন এই পোড়া স্বপ্ন নিয়েই হয় তো কবরে ঘুমিয়ে থাকব। ছোট ভাইটি হয় তো এখনি সন্ধান করবে কোন কাজের। কিংবা দেখা যাবে কোন একদিন আমার কবরের পাশে দাড়িয়ে বলবে কি দায়িত্ব পালন করেছিলে বড় ভাই হিসেবে???? কোনদিন ভালো কোন খাবারও কিনে খাওয়াওনি।  ভালোই হল দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে। কষ্টের খাতা আরও ভারী করার চাইতে চলে যাওয়াই ভালো। সাধারণ মানুষগুলোর এই সাধারণ গল্প তো আর কেউ পড়ে না।  পড়লে প্রত্যেকের জীবন থেকেই এক একটা উপন্যাস হয়ে যেত। প্রত্যেকেই উপন্যাস পড়ত আর বলত আহারে লোকটার মনে কত কষ্ট ছিল,কতশত স্বপ্ন ছিল। আমার মত সাধারণ মানুষগুলোকে যারা পুড়িয়ে মারল তাদের স্বপ্ন আসলে কি? খুব জানতে ইচ্ছে করছে??? জানতে ইচ্ছে করছে পেট্রোল দিয়ে তার ভাই কিংবা মায়ের মুখটা যদি জ্বলে যায় তাহলে তাদের কেমন লাগবে??? খুব জানতে ইচ্ছে করছে…… খুব……

One comment

  1. অনেক খারাপ লাগল গল্প টি পুরোটা পরার পর । কারন যে দায়িত্ব টা বড় ভাই এর সবাই তা পারে না ‘ হয়তো আমিও না’ যাই হোক গল্প টি থেকে কিছু সিখা হল । দোয়া করি আপনার আরো গল্প পড়ার ভাগ্য যেন আমার হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আমি সস্তা লেখক, তাই সস্তা লিখতে ভালোবাসি-মশিউর রহমান শান্ত

শিল্প সাহিত্য ডেস্ক : বর্তমান সময়ের তরুন লেখকদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মশিউর ...

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে কাগজ-কলমের লেখা!

তোফায়েল হোসেন জাকির, গাইবান্ধা প্রতিনিধি : হাতে কলম আর টেবিলে রাখা সাদা ...