ব্রেকিং নিউজ
Home | বিবিধ | পরিবেশ | নড়াইলের মধুমতির ভাঙ্গন অব্যহত : জমি হারিয়ে নিঃস্ব মানুষ

নড়াইলের মধুমতির ভাঙ্গন অব্যহত : জমি হারিয়ে নিঃস্ব মানুষ

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল : নড়াইলের মধমতি নদী ভাঙ্গন অব্যহত থাকায় আতংকে এ গ্রামে গত দুই বছর আগেও ছিল ১১০টি পরিবারের বসতবাড়ি। এর সবগুলোই মধুমতী নদীতে বিলীন হয়েছে। সর্বশেষ গত বর্ষা (চলতি বছর) মৌসুমে অন্তত ৪০টি বসতবাড়ি নদীতে গেছে। ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে এসব মানুষ এখন নিঃস্ব। সর্বশেষ এই ৪০টি পরিবারে বসত বাড়ি নদীতে বিলিন হওয়ায় গ্রামটি এখন শুধু মানচিত্রেরই রয়েছে। বাস্তবে নেয় কোন অস্তিত্ব।

কয়েক বছর পূর্বে যেখানে ছিল হাজারো মানুষের সববার এখন সেখানে মধুমতি নদীর অথৈয় জল। ভাঙ্গন অব্যহত থাকায় আতংকে রয়েছে আলফাডাঙ্গা কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ। নড়াইলের জয়পুর ইউনিয়নের গ্রাম এটি। জেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তরে এ গ্রামের অবস্থান। পার্শ্ববর্তী আলফাডাঙ্গার সীমান্তবর্তী গ্রাম আস্তাইল। গ্রামটি চলতি বছরের বর্ষায় নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মধুমতী নদী নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা এবং ফরিদপুর উপজেলার আলফাডাঙ্গার আটটি গ্রামকে চারপাশ দিয়ে ঘিরে রেখেছে। এর সর্বপশ্চিমে আস্তাইল গ্রাম ছিল। পশ্চিম দিক থেকে নদী বারবার আঘাত করেছে এ (আস্তাইল) গ্রামকে। আস্তাইল গ্রামটি বিলিন হওয়ার পর আলফাডাঙ্গার শিকার পুর, টিঠা গ্রামসহ কয়েকটি গ্রামে ভাঙ্গন ছড়িয়ে পড়েছে। এসব গ্রামের হাজার হাজার মানুষ আতংকিত হয়ে পড়েছে। ঝুকিতে রয়েছে কয়েক শত পরিবার। থেমে থেমে ভাংছে বসত ভিটা, ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা। নদীর অন্য তিনপাশে চর পড়ায় সেখানে ভাঙন নেই।

স্থানীয় লোকজন জানান, ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে এসব মানুষ এখন নিঃস্ব হয়ে গেছেন। খেয়ে না খেয়ে চলছে তাঁদের দিন। নিজেদের এখন বসতবাড়ি করার জায়গায়ও নেই। কেউ অন্য বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আছেন। আবার কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

গ্রামের মকবুল মোল্লার বাড়ি এ পর্যন্ত নদীতে গেছে ছয়বার। ফসলি জমি সব নদীতে। এখন আশ্রয় নিয়েছেন আরেকজনের বাড়িতে। কোনো আয়ের ব্যবস্থা নেই। খেয়া পারাপার করে চালাচ্ছেন তাঁর ছয় সদস্যের পরিবার। দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। তিনি কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘সব হারিয়ে এখন আমি পথের ফকির। সেলিম মোল্লার পৈত্রিক ফসলি জমি ছিল প্রায় ১৬ একর। সব নদীতে গেছে। বসতবাড়ির জায়গাটুকু নদীতে যাওয়ার পর তিনি এলাকা ছেড়েছেন। মেহেরুননেছার বাড়ি নদীতে ভেঙেছে চারবার, আকিদুল মোল্লার বাড়িও চারবার ভেঙেছে।

এভাবে কয়েকবার করে ভাঙনের কবলে পড়ার পর গত বর্ষায় ভাঙনের শিকার হয়েছেন রকিব মোল্লা, রফিকুল সরদার, কামাল শেখ, সরেজান মোল্লা, আশরাফ মুন্সী, মতিয়ার মুন্সী, আরিফ ঠাকুর, নুরু মোল্লা, টুনু ঠাকুর, সালাম ফকির ও তারিফ ঠাকুরসহ অন্তত ৪০টি পরিবার। এলাকাবাসী জানান, ভাঙন অব্যাহত থাকায় আলফাডাঙ্গা উপজেলার কয়েকটি গ্রামে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরো কয়েক শত ঘরবাড়ি। ভাঙন কবলিত পরিবারের সদস্যরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আতঙ্কে পরিবার গুলোর লোকেরা দিনরাত কাজ করছেন শেষ সম্বল টুকু বাচানোর জন্য । আর আশ্রয় খুজছেন নতুন ভাবে বাচার জন্য । বছরের পর বছর ধরে নদী ভাঙ্গনের মধ্যে বাস করা এ সব মানুষেরা এবারের ভাঙ্গনের পরে আর নতুন কোন জায়গা খুজে না পেয়ে উদ্বাস্তুদের মতো আশ্রয় খুজছেন। গত কয়েক বছরে ভিটেবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন কয়েক হাজার পরিবার।

ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভাঙনের মুখে পড়ে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন তাদের ঘরবাড়ি। ভাঙন অব্যাহত থাকায় ভাঙন-আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এসব গ্রামের বাসিন্দারা। ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে কেউ প্রতিবেশি বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, আবার কেউবা রাস্তার পাশে ছাপড়া তুলে আশ্রয় নিয়েছেন। নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন অনেকে। মানবেতর দিন যাপন করছেন তাঁরা । এত বছরে ও ভাঙ্গন ঠেকাতে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

এলাকার জনপ্রতিনিধি সহ এগিয়ে আসেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড অভিযোগ এলাকাবাসীর। ভাঙ্গন পিড়ীত এলাকার মানুষের আশা নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে সরকারী ভাবে উদ্যোগ নেয়া হবে। এলাকাবাসীর অভিযোগ রাজনৈতিক দলের লোকেরা ভোট নেয় আর নদী ভাঙ্গন এলাকার নিপীড়িত মানুষের কোন খোজ নেয় না। স্থানীয় ইউপি সদস্য জানান, এখনো সরকারি কোনো সাহায্য ক্ষতিগ্রস্তরা পাননি। ইউনিয়ন পরিষদে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় জয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকতার হোসেন জানান, ‘দুই বছর আগেও ছিল এ গ্রামে ১১০টি পরিবার। মধুমতী নদী এ গ্রামের অস্তিত্ব বিলীন করেছে। এসব পরিবার এখন নিঃস্ব। গত বছর এসব পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছিল। এ বছর তালিকা করে দেড় মাস আগে ইউএনও কার্যালয়ে দেওয়া হয়েছে। এখনো কোনো বরাদ্দ হয়নি।

ইউএনও মুকুল কুমার মৈত্র বলেন, ‘বরাদ্দ চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে আগেই। দেখি এখন কথা বলব। আর ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।’দীর্ঘদিন ধরে মধুমতি নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকা রক্ষায় নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ কোন আশার কথা শোনাতে না পেরে প্রকল্প জমা দেয়া হয়েছে বলে জানালেন নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী শাহানেওয়াজ তালুকদার।

তিনি আরও জানান, বর্ষা মৌশুমে লোহাগড়া উপজেলার মধুমতি নদী প্রতি বছরই কম বেশি ভাংতে থাকে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বড় প্রকল্প তৈরী করে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারলে সমস্যা থাকবেনা।নদীর ভাঙ্গন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করবে এমনটিই প্রত্যাশা ভূক্তভোগিদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ফুরফুরে মেজাজে নৌকার প্রার্থীরা, দৌড়ের পরে আছেন ধানের শীষসহ অন্য প্রার্থীরা

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে নৌকার ...

দিনাজপুরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সহ গ্রেফতার ৩

দিনাজপুর প্রতিনিধি : জামায়াতের নেতা দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো: নুরে ...