ব্রেকিং নিউজ
Home | শিল্প সাহিত্য | ফিচার | দুর্নীতি না হলে কেমন হতো বাংলাদেশ

দুর্নীতি না হলে কেমন হতো বাংলাদেশ

এস এম মুকুল: ফিচার ও কলাম লেখক :আদর্শের রাজনীতি যতদিন প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন দুর্নীতি থামানো যাবে না। সে জন্য রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সবার আগে জরুরি। সব পেশার ক্ষেত্রে পেশাগত সততা থাকতে হবে। দেশের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে না। আসুন আমরা সবাই মিলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখি।                  

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের বনখেকো ওসমান গনির কাহিনী নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। সেই বন কর্মকর্তা ওসমান গনির দুর্নীতির অনুসন্ধানে তার বাসায় বালিশের ভেতর, চালের মটকায়, বিছানার তলে টাকার পাহাড় পাওয়া গিয়েছিল। বন কেটে সাবাড় করে পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে টাকার পাহাড় বানিয়ে তিনি চিরসুখী হওয়ার স্বপ্নপুরী বানাতে চেয়েছিলেন। আমরা সাবেক রেলমন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুকের কাহিনী জেনেছি। সেই ওমর ফারুক আমার স্কুলজীবনে ক্লাসমেট, আমি লজ্জিত। শুধু তারা কেন, সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা থেকে পিয়ন পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার খবর জানা যায় প্রায়শই। এসব খবর দুর্নীতিপ্রবণ বাংলাদেশের নমুনা মাত্র। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে যেভাবে দুর্নীতিবাজ আর অবৈধ দখলবাজদের ধরপাকড় শুরু হয়েছিল, এ কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চালালে সরকারের অর্থভা-ার অনেক শক্তিশালী হয়ে যেত। আন্দাজ করে বলা যায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সঠিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা গেলে এ দেশে রাস্তাঘাটে টাকার বস্তা কুড়িয়ে পাওয়া যাবে। ছিনতাইকারীদের আর কষ্ট করে পথে-ঘাটে মানুষ আটকাতে হবে না।
দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে গোটা বাংলাদেশ। দুর্নীতির দুর্নামে বিশ্বে তালিকায় নাম উঠেছে বাংলাদেশের। অফিসের কেরানি থেকে বিগ বস, বিদ্যুৎ বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ, ওয়াসা, ভূমি অফিস থেকে শুরু করে সব দপ্তর, অধিদপ্তর, প্রশাসনিক অফিস, সচিবালয় থেকে ইউনিয়ন কাউন্সিল পর্যন্ত দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কোনো কোনো অফিসের চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত নাকি ঘুষ খায়_ এমন কথারও প্রচলন আছে। আমাদের মন্ত্রী-এমপি, তাদের পুত্ররা, প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর পুত্ররা, উপদেষ্টা মহাশয়রা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সব পেশার মানুষ। এর পরও কি সৎ মানুষ নেই! সংখ্যাধিক্যে সৎ-নিষ্ঠাবান মানুষই বেশি। কিন্তু অসৎ, দুর্নীতিবাজদের দাপটে তারা কোণঠাসা।
আচ্ছা ভাবুন তো, দুর্নীতি না হলে কেমন হতো বাংলাদেশ? রেলে দুর্নীতি না হলে রেল যোগাযোগ হতো গণমুখী নিরাপদ পরিবহন। বিদ্যুতে, ওয়াসায় দুর্নীতি না হলে আমরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ পেতাম ঠিকঠাকমতো। মন্ত্রী, এমপিসহ জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতিবাজ না হলে অথবা তারা দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় না দিলে এ দেশের রাস্তাঘাট আরো কত উন্নত থাকত, সহজেই ভাবা যায়। রোড, ব্রিজ, কালভার্টে ভরপুর থাকত বাংলাদেশ। ঢাকার ফ্লাইওভারগুলো সবচেয়ে কম সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে দুর্নীতি না হওয়ার কারণেই। দুর্নীতি না হলে সারা জীবন চাকরির সম্বল পেনশনের টাকা তুলতে ফাইল আটকে থাকত না। নিয়োগে দুর্নীতি না হলে সহজে চাকরি পেত নাগরিকরা। নীতিবান মানুষের মর্যাদা সমাজে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হলে দুর্নীতির প্রবণতা কমে যেত।
লোকে বলে এ দেশের সমৃদ্ধির বারো আনাই খেয়ে ফেলে দুর্নীতি। সরকারি কাজে দুর্নীতির ঠেলায় সুনীতি বা নীতিবানদের চরম দুর্দশার শেষ নেই। বেসরকারি খাতেও এ রোগ ছড়িয়ে গেছে ক্যান্সারের মতো। আমাদের সরকারগুলোর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, স্বেচ্ছাচারিতা আর ক্ষমতার অপব্যবহারে কলুষিত হয়ে দেশ দুর্নীতির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নীতিভ্রষ্টতা রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ছড়িয়ে গেছে সর্বসাধারণের মধ্যে। এর ফলে ধ্বংস হয়েছে সব প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চলছে নিয়ম ভাঙার মহোৎসব। আমাদের জনপ্রতিনিধিরা হরিণ পোষেন মনের সুখে। চড়েন দামি গাড়িতে, থাকেন আলিশান বাড়ি করে। আর ব্যাংকের টাকার কথা কী বলব? এর পরও তাদের ক্ষুধা মেটে না। সাতপুরুষ বসে খাওয়ার মতো সম্পদ ভোগদখল করে থাকলেও লোভ সামলাতে পারে না তারা। ফলে বন খায়, ধন খান, হাওর-বিল-খাল ও নদী খায়। খাওয়ার লিপ্সার যেন শেষ নেই। কত ক্ষুধা আছে মানুষের পেটে!
এবার দুর্নীতির প্রমাণ সম্পর্কে কিছু তথ্য দিই আপনাদের। প্রকাশিত এক খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অঢেল গোপন অর্থ আছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে। বলা হয়েছে, ওই দ্বীপাঞ্চলে অর্থ রেখে ব্যবসার তালিকায় বাংলাদেশের কমপক্ষে ২০ জন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও প্রভাশালী রাজনীতিকের নাম আছে। রিপোর্টে বলা হয়, সেখানে সারা বিশ্বের ব্যবসায়ী, পুঁজিপতিরা নিজ দেশে কর ফাঁকি ও দুর্নীতির টাকা লগি্ন করছেন। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ‘ব্যাংক ইন সুইজারল্যান্ড, ২০১২’ প্রতিবেদনে জানা যায়, সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের অন্তত ২২ কোটি ৯০ লাখ সুইস ফ্রা যা বাংলাদেশি টাকায় ১ হাজার ৯০৮ কোটির সমান জমা আছে। আরেক খবরে জানা গেছে, মালয়েশিয়া সরকারের ‘মাই সেকেন্ড হোম’ প্রোগ্রামের আওতায় এ পর্যন্ত নিজ উদ্যোগে প্লট-ফ্ল্যাট কিনেছেন সাত হাজার বাংলাদেশি। অভিযোগ আছে, হুন্ডির মাধ্যমে এই ব্যক্তিরা ১০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। পাচারকারীদের তালিকায় আছেন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, সাবেক আমলা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। হায়রে টাকা! আমার দেশের মানুষ এক বেলা খাবার জোগাড় করতে কত না পরিশ্রম করে। কত ধরনের কাজ করে। এ দেশেরই কারো কারো টাকার পাহাড় দেখে মনে হয় টাকার কোনো মা-বাপ নেই।
বঙ্গবন্ধু ঠিকই বলেছিলেন_ যত লোভ-লালসা আর ভোগ-বিলাসের সব কিছু যেন শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই বেশি। স্বাধীনতা অর্জনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে বহুমুখী কার্যক্রম শুরু করেও বঙ্গবন্ধু পদে পদে বাধাগ্রস্ত হন। এরপর শুরু করেন স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার দ্বিতীয় মিশন। তাই তিনি উৎপাদন বৃদ্ধি, দুর্নীতি উৎখাত ও আত্মশুদ্ধির নির্দেশনা দেন জাতিকে। শিক্ষিত সমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শিক্ষিত সমাজের কাছে আমার একটা কথা_ আমরা শতকরা কতজন শিক্ষিত লোক? আমরা শতকরা ২০ জন শিক্ষিত লোক। এর মধ্যে সত্যিকার অর্থে আমরা শতকরা পাঁচজন শিক্ষিত। আপনাদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন_ আমি এই যে দুর্নীতির কথা বললাম, এসব কারা করে? আমার কৃষক দুর্নীতিবাজ? না। আমার শ্রমিক দুর্নীতিবাজ? না। তাহলে ঘুষ খায় কারা? বস্ন্যাক মার্কেটিং কারা করে? বিদেশে টাকা চালান দেয় কারা? এই আমরা যারা পাঁচ ভাগ শিক্ষিত। এই আমাদের মধ্যেই রয়েছে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ। আমাদের চরিত্রের সংশোধন করতে হবে। আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’ তাহলে বোঝা গেল দুর্নীতি নামক রোগটি বাঙালি জাতির সঙ্গে মিশে আছে স্বাধীনতার আগে থেকেই।
একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশে ব্যাংক থেকে ঋণের নামে যথেচ্ছারভাবে অর্থ লুটপাট হয়। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে টাকা ফেরত না দেয়াটা একটা দম্ভের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা ১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি। জনগণের টাকা নিয়ে বাড়ি-গাড়ি, বিত্তবৈভবে আয়েশি জীবন কাটাচ্ছেন ঋণখেলাপিরা। ১ লাখ ২৮ হাজার খেলাপির ঋণের পরিমাণ কত হতে পারে? একটি-দুটি পদ্মা সেতুর জন্য আমাদেরকে দাতা গোষ্ঠীর কাছে মাথা নত করার দরকার আছে? এই ঋণখেলাপিরা সরকার বা রাজনৈতিক মদদ পেয়ে দেশের জনগণের টাকা নিয়ে নিজেদের আখের গোছায়। তাদের বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় না বলেই দুর্নীতি কমে না। দুর্নীতি আর লুটেরা বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশের একশ্রেণির মানুষের কাছে চলে গেছে সব টাকা। তারা দেশে সাত পুরুষের ভোগবিলাসের অঢেল সম্পদ রেখেও তৃপ্ত নয়। দুর্নীতির অভিযানে ধরা খেয়ে মারা পড়ার ভয়ে বিদেশবিভূঁইয়ে গড়ে তুলছে বাড়ি ও ব্যবসাপাতি।
স্বাধীনতার ৪২ বছরে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। দুর্নীতি না হলে এ দেশ আরো ২০ বছর আগে মালয়েশিয়ার মতো দেশে উন্নীত হতো। দেশে যে পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য আসে সরকারিভাবে সেগুলো জনগণের কাছে পেঁৗছে দেয়ার কথা। এনজিওরা যে সাহায্য পায়, দেশের গরিব জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোর উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা। উঁচু স্তর থেকে নিচু স্তরে ভাগ-বাটোয়ারা করে প্রায় ৭৫ শতাংশ খেয়ে ফেলে দায়িত্বপ্রাপ্তরা। বাদবাকি ২৫ শতাংশ নিয়ে টানাহেঁচড়া করে জনগণ যা পায় তা দিয়ে কাজের কাজ কিছুই হয় না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এসব সাহায্যের ২৫-৩৫ ভাগ যদি যথাযথ স্থানে পেঁৗছানো হতো তাহলে দেশের চেহারা ১০ বছরে পাল্টে যাবে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে সাহায্য আসছে আর ভোগবাদীরা খেয়ে-পরে যা থাকে তার ছিটেফোঁটা পাচ্ছে আমজনতা। এই দুর্নীতি কবে বন্ধ হবে?
দুর্নীতি ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে আমাদের কিছু করা দরকার। কারণ এই দুর্নীতি আর সামাজিক অবক্ষয়ই বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ৫০০ জন দুর্নীতিবাজকে জেলে পুড়তে পারলে নিজেকে সফল ভাবতাম। প্রতি বছর অন্তত ১০০ জন দুর্নীতিবাজকে সাজা দেয়া গেলে সমাজে বড় ধরনের প্রভাব পড়ত। আচ্ছা, দুদক তো পারত বছরে ১০০ জন দুর্নীতিবাজের শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে। কেন হয় না, কারণ আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছেন না।
আদর্শের রাজনীতি যতদিন প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন দুর্নীতি থামানো যাবে না। সে জন্য রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সবার আগে জরুরি। সব পেশার ক্ষেত্রে পেশাগত সততা থাকতে হবে। দেশের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে না। আসুন আমরা সবাই মিলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সুকুমার রায়ের প্রয়াণ আজ

ফিচার ডেস্ক : ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। প্রতিদিনের ...

পর্যটন সম্ভাবনাময় হাওর

ফিচার ডেস্ক : সমুদ্র নয়, সমুদ্রের মতোই বিশাল জলরাশি। মাঠঘাট সব পানিতে একাকার। ...