Home | ফটো সংবাদ | দিন যায় কথা থাকে

দিন যায় কথা থাকে

স্টাফ রিপোর্টার :  আশ্রাফ আলীর বড় মেয়ে আঞ্জুমান আরার একমাত্র মেয়ে আসমা নুসরাত। নানার ডায়েরিটি যত্নে রেখেছেন তাঁরই দেওয়া স্টিলের আলমারিতে। ডায়েরিটি তাঁকে ফেলে আসা দিনগুলোর গান শোনায়। পাঠকদেরও তার ভাগ দিচ্ছেন

আমার নানা বিখ্যাত কোনো মানুষ ছিলেন না। তবে তিনি যাকে বলে সেল্ফ মেইড মানুষ ছিলেন। বাড়ি ছিল বরিশালে। ছোটবেলায়ই রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিলেন ঢাকায়। নিউ মার্কেটে মুরগির আড়ত করেছিলেন। বিয়ে করেন ১৯৬০ সালে। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৯। কাঁটাবনে এখন যেখানে মাসকট সুজ, সেখানে তিনি বাড়ি করেছিলেন বিয়ের কিছু আগে। বিয়ে করেছিলেন প্রেম করে। মেয়েটার নাম আফরোজী।   রোজীর দাদা পাঞ্জাব থেকে বাড়ি বদলে এসে বসতি গড়েন তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। এখন যেখানে ঢাকা কলেজ তার কাছেই থাকতেন আফরোজীরা। তাঁর বাবার দোকান ছিল নিউ মার্কেটে। ফ্রক পরে প্রায় বিকেলে বাবার দোকানে যেতেন আফরোজী। বয়স ৮-৯ বছর। আমার নানার মনে ধরল মেয়েটিকে। চকোলেট, চুড়ি, ফিতা দিতেন কিনে। মাঝেমধ্যে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতেন। আফরোজীর বাবা বিষয়টি জানতে পেরে রেগে টং হয়ে গেলেন। লম্বা, ফরসা মানুষ ছিলেন। ভাবলেন, আর যাই হোক মুরগিওয়ালার সঙ্গে তো মেয়ের বিয়ে দেওয়া যায় না। তার ওপর চালচুলো কিছু নেই। আশ্রাফ আলী বুঝতে পেরে কাঁটাবনে, মানে ওই মাসকট সুজের ওখানে, জমি কিনে দোতলা বাড়ি করে ফেললেন। তবু আফরোজীর বাবার মন গলেনি। মেয়েকে তিনি নবাবপুরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে  গোপনে পাঠিয়ে দিলেন। যুবক আশ্রাফ আলী তাতে দমলেন না। একটি সাইকেল কিনে খুব সকালে চলে যেতেন নবাবপুর। রাস্তায় রাস্তায় শিস দিয়ে বেড়াতেন। আফরোজী চিনতেন ওই শিস। আশ্রাফ

আলীর তাই বিশ্বাস ছিল—একদিন ঠিকই আফরোজী শিস শুনে বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়াবেন। অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনাটি ঘটেছিল। আফরোজী সত্যি একদিন এসে ছাদে দাঁড়িয়েছিলেন, তার পর থেকে নিয়মিতই। বাড়িটার ধারে একটি পুকুর ছিল। আফরোজীকে আশ্রাফ বলেছিলেন, কোনোমতে পুকুরে এসে নামতে পারলেই তাঁরা চম্পট দিতে পারবেন। কিন্তু তাঁর আগেই কী বুঝে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন আফরোজীর বাবা। লোক ডেকেই বিয়ে পড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেটি ছিল ১৪ রমজান ১৩৭৯ হিজরি। মোহাম্মদ মনসুর আলী, কাজী ওয়াজুদ্দিন প্রমুখ ছয়জন ছিলেন সাক্ষী। দেনমোহর ধার্য হয়েছিল ১০০১ টাকা। আশ্রাফ আলীকে কনে গ্রহণ বাবদ চার আনা ওজনের ৮ গাছা সোনার চুরি, এক ভরি ওজনের সোনার হার ও এক আনা ওজনের এক জোড়া কানপাশা দিতে হয়েছিল। কাবিননামায় আরো উল্লেখ ছিল, কাপড় বিবাহের উপযুক্ত নতুন হওয়া চাই। কাবিননামা লেখক : মোহাম্মদ ইউসুফ সরদার (৬ নম্বর খাজা মোহাম্মদ আজিম লেন, ঢাকা)। নানিকে নিয়ে নানা কাঁটাবনের বাড়িতে এসে ওঠেন। দুই বছরের মাথায় তাঁদের প্রথম কন্যা আঞ্জুমান আরা মানে আমার মায়ের জন্ম হয়। নানার ডায়েরিটির একটি পাতার লেখা হুবহু :

হাতেখড়ি: ‘মোসাম্মৎ আন্জুমান আরা বেগম। ১৯৬৫ ইং সনের ৮ই জানুয়ারী (১৩১০ বাং ২৪শে পৌষ) রোজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬.২১ মিনিটে প্রথম বাংলায় হাতেখড়ি নিলঃ—ওস্তাদ ঃ নিত্যরঞ্জন সরকার। ’

আঞ্জুমান আরার ডাক নাম মায়া। মায়ার পর তাঁদের আরেক কন্যাসন্তান জন্মায়। নাম রাখা হয় ফাতেমা বিবি। তিনি ছোটবেলায়ই মারা যান। তারপর ছেলে আনোয়ার হোসেন, আমীর হোসেন, আওলাদ হোসেন ও আমজাদ হোসেন একে একে জন্মগ্রহণ করেন। আমীর হোসেনের জন্মের বিষয়টি নানা লিখে গেছেন এভাবে—

‘মোহাম্মদ আমীর হোসেন (স্বপন)। ১৯৬৬ সনের ২৪শে ফেব্রুয়ারী (১২ই ফাল্গুন ১৩৭২ বাংলা) দুপুর ২-৪৫ মিনিটে রোজ বৃহস্পতিবার ২২২ নং দক্ষিণ ধানমণ্ডিস্থ নিজ বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করে। কন্যা রাশি। ঐ দিন ফুরফুরা শরীফের আ’লা হজরত পীর কেবলার জানাজা ও দাফন। ’

মায়ার প্রেম : আশ্রাফ আলীর কাঁটাবনের বাড়িতে ভাড়া থাকতে আসেন ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছু পরে। ফরহাদ তাঁর শ্বশুরের সঙ্গে ভারতের আগরতলায় থাকতেন। সেখানে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের কিছুকাল পরে ফরহাদ উদ্দিনের শ্বশুরবাড়ি বদলে চলে আসেন ঘোড়াশাল। ফরহাদ মিয়া ঢাকার বায়তুল মোকাররমে একটি মনোহারি দোকান দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ঢাকায় চলে আসেন সপরিবারে। তাঁর দ্বিতীয় ছেলে ফারুক মিয়া। খুব সুশ্রী, শান্ত স্বভাবের। আঞ্জুমান আরা ওরফে মায়াকে তাঁর পছন্দ। কিন্তু বলার সাহস করতে পারেন না। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে দাঁড়িয়ে থাকেন। এর মধ্যে আশ্রাফ আলী মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি কিনে সেখানে উঠে যান। ফারুক সমবয়সী মতি কাকাকে সাইকেলের পেছনে চড়িয়ে মোহাম্মদপুরে যাওয়া-আসা করেন। মায়াকে কিছু বলা হয় না। তবে আশ্রাফ আলী ব্যাপারটি ঠাহর করতে পেরে রেগে টং হয়ে যান। মায়াকে সাফ বলে দেন, ফারুকের সঙ্গে কোনো কথা নয়। কিন্তু ফারুক আশা ছাড়েন না। পরে ফারুকের বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গেলে ভাবির কাছে আবদার করেন ফারুক। ভাবি সম্পর্ক করে ফেলেন। তত দিনে ফারুকরা বাড়ি করেছেন মিরপুর ৬ নম্বরে।

মায়ার বিয়ে বিষয়ে নানার ডায়েরি : ‘আল্লাহর রহমতে অদ্য রোজ হিজরি ১৭ই রবিউল আউয়াল ১৪০৪, বাংলা ৭ই পৌষ ১৩৯০, ইংরেজী ২৩শা ডিসেম্বর ১৯৮৩ লালমাটিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আমার একমাত্র কন্যা

মোসাম্মৎ আঞ্জুমান আরা (মায়া)র সহিত মিরপুর নিবাসী মোঃ ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ এর দ্বিতীয় পুত্র এস. এম. ফারুক উদ্দিন আহমেদ, গ্রাম-বন সেমন্ত, বালিগাঁও, থানা : লৌহজং, জিলা : ঢাকা এর শুভ বিবাহ কার্য্য সুসম্পন্ন হয়। এই অনুষ্ঠানে বহু গন্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। বিবাহ কার্যকর হয় বিকাল ৩.৩০ মিনিটে। ’

বরিশালের বাড়ি থেকে চলে এসেছিলেন নানা রাগ করে। কিন্তু বাড়ির লোকজনের খোঁজখরব করতেন নিয়মিত। প্রয়োজনে অর্থ সাহায্য পাঠাতেন। বরিশালের আত্মীয়স্বজন ঢাকায় এলে নানার বাড়িতেই উঠত। মেয়ে মায়ার বিয়ের পরপরই তিনি বাড়ি খুঁজতে থাকেন মিরপুরে। একমাত্র মেয়েকে দূরে পাঠিয়ে তিনি শান্তিতে ঘুমাতে পারছিলেন না। মিরপুরের বাড়ি কেনার কিছুকাল পরে তিনি বড় ছেলে আনোয়ার হোসেনের বিয়ের আয়োজন করতে লেগে যান। নিজের ছোট ভাইকে বলে পাঠান বড় মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় উপস্থিত হতে। আনোয়ার আগে থেকে কিছুই জানত না। ছোট ভাই হাছানুল কবির মেয়ে মমতাজকে নিয়ে ঢাকায় এলে আশ্রাফ আলী ভাতিজিকে কাছে বসিয়ে বলেন, মা তোমার এখন বিয়ে করার মত আছে?

মমতাজ ভয় পেয়ে যায়। আশ্রাফ আলী পরপর তিনবার একই প্রশ্ন করেন। শেষবার মমতাজ বলে, আপনারা মুরব্বি, যা ভালো বোঝেন করেন। উত্তর পেয়ে আশ্রাফ আলী বড় ও মেঝ দুই ছেলেকেই ডেকে পাঠান। মমতাজকে দেখিয়ে বলেন, এদের মধ্যে কাকে তোমার পছন্দ? মমতাজ বড় ছেলেকেই দেখায় আঙুল দিয়ে। তারপর সে রাতেই বিয়ের আয়োজন হয়।

ডায়েরি থেকে হুবহু : ‘অদ্য রোজ রবিবার ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ ১৩৯৮ বাংলা, ৪ঠা জেলকদ ১৪১১ হিজরি, ১৯ শে মে ১৯৯১ সাল। আমার প্রথম পুত্র মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (আজাদ)-এর সহিৎ আমার ছোট ভাই কাউখালীর দাসের কাঠি নিবাসী মোঃ হাছানুল কবির-এর প্রথমা কন্যা মোসাম্মত মমতাজ বেগম-এর বিবাহোত্তর শুভ কাবিন অনুষ্ঠিত হয়। ২৫০০১ (পঁচিশ হাজার এক টাকা) দেনমোহরে সুসম্পন্ন হয়। রাত ১১ টায়, উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলহাজ্ব মাওলানা হাফেজ মোঃ আব্দুর রউফ সাহেব, পেশ ইমাম, লালমাটিয়া বিবির মসজিদ। ’

ডায়েরি প্রসঙ্গে : এটি সে অর্থে দিনপঞ্জি নয়। বরং বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঘটনার বয়ান। ডায়েরিটি ১৯৭০ সালের। ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স কম্পানি অব পাকিস্তান লিমিটেড এটি প্রকাশ করেছিল। ডায়েরিটির একটি পৃষ্ঠার শিরোনাম : ‘পারসোনাল মেমোরেন্ডাম’। এতে নানা তাঁর

ঘড়ির

বর্ণনা লিখেছেন : ‘সিকো ৮৮১৫৮২ জাপান—ই ব্ল্যাক, ডায়াল ১৭ জুয়েলস। ’ লিখেছেন ‘টিভি সেট স্যানিও’। তাঁর মোটরসাইকেলের লাইসেন্স নম্বরও লিখেছেন। বহু পৃষ্ঠা খালি রেখে ডায়েরির প্রায় শেষদিকে একটি সমসাময়িক ঘটনার উল্লেখ করেছেন (১৫/১০/১৯৭২ তারিখে লেখা) : ‘১২ই নভেম্বর ১৯৭০ ইং। এই দিনে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রচণ্ড ঝড়তুফান হয়। এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১২ লক্ষ লোক মারা যায়। বিশেষ করে ভোলা, বরিশাল, সন্দ্বীপ এবং নোয়াখালীতে বেশী লোক মারা যায়। ’ এর ঠিক পরের পৃষ্ঠায় (১৭/১০/৭২ তারিখে লেখা ): ১৯৭১ ইং সনের ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত্রে বর্বর পাক বাহিনী বাংলাদেশে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে) অকথ্য হামলা চালায়। প্রচুর লোক মারা যায়। প্রায় ৩০ লক্ষ। এবং প্রায় ১ কোটি লোক গৃহহারা হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এরপরেই সংগ্রাম শুরু হয়। ’

শেষমেশ : আমার নানা খুবই গোছানো মানুষ ছিলেন। বাড়িতে যত গাছ লাগিয়েছেন সব কটিই ভালো ফল দিয়ে থাকে। মেয়েকে দেখতে প্রতিদিন ফরহাদ উদ্দিনের বাড়িতে একবার হলেও চক্কর দিতেন। একমাত্র মেয়ের একমাত্র কন্যা হওয়ায় আমি নানার আদর পেয়েছি বেশি। তিনি মারা গেছেন ২০০২ সালের ১ এপ্রিল। তার আগে আমাকে তাঁর অনেক জিনিসপত্রের মালিক করে গেছেন। যেমন একটি রুপার তসবিহ। ধন্যবাদ নানা। আপনি আমার সঙ্গেই আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আগামীকাল সোমবার ভিয়েনার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার :  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অস্ট্রিয়ায় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) ...

অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন অন্তর শোবিজের পরিচালক লিটন চৌধুরী

বিনোদন ডেস্ক :  অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন অন্তর শোবিজের পরিচালক ...