ব্রেকিং নিউজ
Home | জাতীয় | ঢাকা ওয়াসায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

ঢাকা ওয়াসায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকা ওয়াসায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠছে একের পর এক, কিন্তু সুরাহা হচ্ছে না কোনো একটিরও। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের একাংশের বিরুদ্ধে ওঠছে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের অভিযোগ। এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ ওঠলেও কোনো কিছুতেই কান দিচ্ছেন না ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানকে মধ্যমণি রেখে এই চক্রটি অনিয়মের নানা ডালপালা মেলেছে বলে অভিযোগ আছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরেও লিখিত এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। তবে এতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়েছে এমন নজির নেই।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ওয়াসার কর্তাব্যক্তিরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদেরও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ৩০০ ফুট প্রশস্ত কুড়িল-পূর্বাচল সংযোগ সড়ক নিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে। রাজউকের ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) ওই সংযোগ সড়কের কুড়িল থেকে বালু নদী পর্যন্ত ৫.৮ কিলোমিটার অংশের উভয় পাশে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ১০০ ফুট প্রশস্ত খাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী প্রস্তাবিত খালের প্রস্থ যা-ই ড্যাপে উল্লেখ থাকুক না কেন, বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত গবেষণার মাধ্যমে খালের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্থ নিরূপণ করা আবশ্যক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি কুড়িল-পূর্বাচল সংযোগ সড়কের উত্তর দিক লাগোয়া অংশে অবস্থিত। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডাব্লিউএম) প্রকাশিত এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, সংযোগ সড়কের উত্তর পাশে ১০০ ফুট খালের প্রয়োজন নেই। এর চেয়ে অনেক কম চওড়া খাল দিয়েই বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন সম্ভব।
পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির রিপোর্ট প্রকাশের আগে তাকসিম প্রধানমন্ত্রীর কাছে বেশ কিছু মিথ্যাচার করেন। কুড়িল-পূর্বাচল সংযোগ সড়ক করার সময় রাজউক অনেক খাল ভরাট করেছে এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য সংযোগ সড়কের উভয় পাশে ১০০ ফুট করে খাল খননের কথা বলেছে।
সংশ্লিষ্ট এলাকার অতীতের সব জরিপ ও ম্যাপ (সিএস, আরএস) থেকে দেখা যায়, সংযোগ সড়ক এবং এর উভয় পাশে ১০০ ফুট বরাবর কুড়িল থেকে বালু নদী পর্যন্ত কোনো খাল ছিল না। সুতরাং রাজউক বা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভরাট করার প্রশ্নই আসে না।
আইডাব্লিউএমের পুলিশ হাউজিংয়ের গবেষণালব্ধ রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, সংযোগ সড়কের উভয় পাশে ১০০ ফুট খালের বদলে অনেক কম প্রস্থের খাল দিয়েই বৃষ্টির পানি সরিয়ে দেওয়া সম্ভব। অথচ ওয়াসার এমডি সব সময় সরকারের উচ্চপর্যায়ে বলে আসছেন, ১০০ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট খাল ছাড়া কোনোক্রমেই বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন সম্ভব নয়।
এবার কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে তাকসিম একটি পত্রের মাধ্যমে আইডাব্লিউএমকে তাদের পুলিশ হাউজিং রিপোর্টটি প্রত্যাহার করার কথা জানান। অন্যথায় আইডাব্লিউএমে ওয়াসার সব অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হবে এমন হুমকিও দেন। আইডাব্লিউএম এই হুমকিতে অসহায় হয়ে পুলিশ হাউজিং রিপোর্টটি প্রত্যাহার করার চেষ্টা করে এবং ওই রিপোর্টের দায়িত্বে নিয়োজিত একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করার অভিযোগ আছে।
সূত্র জানায়, রাজউক ইতিমধ্যে সড়কের দুই পাশে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল কতটুকু চওড়া হবে তা ঠিক করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটের) পানি সম্পদ কৌশল বিভাগকে দায়িত্ব দেয়। সম্প্রতি বুয়েট ওই গবেষণার পূর্ণাঙ্গ এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনটি রাজউক অনুমোদন করে ড্যাপ রিভিউ কমিটিতে পাঠালে প্রতি অনুমোদিত হয় বলে জানা যায়।
বুয়েটের প্রতিবেদন বলছে, কুড়িল-পূর্বাচল সংযোগ সড়কের উভয় পাশের এলাকার বৃষ্টির পানি সড়ক সংলগ্ন অংশে প্রবাহিত না হয়ে মূলত বোয়ালিয়া খাল এবং কাঁঠালদিয়া খাল দিয়ে বালু নদীতে নিষ্কাশিত হবে। সংযোগ সড়কের উত্তর পাশে কুড়িল মোড় থেকে বোয়ালিয়া খাল পর্যন্ত স্থানভেদে আট থেকে ২৫ ফুট সড়ক সংলগ্ন খাল তৈরি করলেই বৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত হবে; কোনোভাবেই ১০০ ফুট খাল প্রয়োজন হবে না।
বুয়েটের প্রতিবেদনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সংযোগ সড়কের উত্তর পাশে বোয়ালিয়া খাল থেকে বালু নদী পর্যন্ত এবং সংযোগ সড়কের দক্ষিণ পাশে কুড়িল মোড় থেকে বালু নদী পর্যন্ত সড়ক সংলগ্ন কোনো খাল প্রয়োজন হবে না।
৫৫০ কোটি টাকা লোপাট!
কাজ না করেই দুটি প্রকল্পের নামেই ৫৫০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে ওয়াসার অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে। ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্প (ফেজ-১) এই অনিয়মের সাক্ষী। প্রকল্পের অনুমোদন হয়নি অথচ তার আগেই পছন্দমাফিক ঠিকাদারের সঙ্গে কাজের চুক্তিপত্র সম্পাদন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দরপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, কোনোরকম ভেটিং পর্যন্ত করা হয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ওই প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের আগে চড়া সুদের টাকায় নি¤œমানের পাইপ আমদানিরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে পদ্মা (জশলদিয়া) প্রকল্প থেকেই ৫০০ কোটি টাকা লুটপাটের চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতি-লুটপাটের সবকিছু ঠিকঠাক রাখার স্বার্থে প্রকল্পের পরিচালকের পদ থেকে প্রকৌশলী এম এ রশিদ সিদ্দিকীকে পর্যন্ত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পের (ফেজ-১) ব্যয় নির্ধারণ করা হয় তিন হাজার ৫০৮ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে দুই হাজার ৪২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেবে চায়না এক্সিম ব্যাংক। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার ও ঢাকা ওয়াসা।
ঋণের জন্য চায়নার এক্সিম ব্যাংককে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। সরকার ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর একনেকের বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন দেয়। পদ্মার জশলদিয়া পয়েন্টে এ শোধনাগারটি স্থাপন হবে। সেখান থেকে পরিশোধিত পানি কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য বসানো হবে পাইপ। বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশ দিয়ে এ পাইপ পৌঁছে যাবে রাজধানীতে। এজন্য জশলদিয়া পয়েন্ট এবং কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত পাইপ বসানোর জন্য জমির প্রয়োজন হবে। এ ব্যাপারে সরকারি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি, চূড়ান্ত প্রকল্প অনুমোদনও হয়নি।
সূত্র জানায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসা চুক্তি করে ২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। এ ক্ষেত্রে কোনো দরপত্র পর্যন্ত আহ্বান করা হয়নি। দরপত্র আহ্বান হলে অন্যান্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নিত এবং ভেটিং পদ্ধতিতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ কমে যেত নির্মাণ খরচ। ফলে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে অন্তত ৩৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারত।
এদিকে এমডির ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি উল্টো শর্ত জুড়ে দেয়। চীন থেকে নি¤œমানের পাইপ উচ্চ দামে আমদানি করার শর্ত পালন করায় ওয়াসা আরও ১৫০ কোটি টাকা গচ্চা দিচ্ছে। ওয়াসার পুরনো ঠিকাদাররা জানিয়েছেন, গচ্চা, ভর্তুকি, দরকষাকষি না করার বাহানায় মূলত কোটি কোটি টাকা লুটপাটই করা হচ্ছে। ফলে পদ্মার জশলদিয়া প্রকল্প শুরুর আগেই ৫০০ কোটি টাকা হরিলুটের সবকিছু চূড়ান্ত হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসা গুলশান লেককে দূষণমুক্ত করার যে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল তাও লুটপাট প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ও হয়ে গেছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অসংখ্য নালা-নর্দমার সংযোগপথে প্রবাহিত পয়ঃবর্জ্যে লেকজুড়ে সীমাহীন দূষণ ঘটেই চলছে।
সেখানে উন্নয়ন কাজ বলতে কী হয়েছে তাও জানেন না আশপাশের বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, কাগজপত্রে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ৫০ কোটি টাকা নয়ছয় হয়েছে মাত্র। রাজউকের তথ্যমতে, গুলশান-বারিধারা লেকের বড় ১৮টি পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন সরাসরি পয়ঃবর্জ্য মিশছে গুলশান লেকে। এর বাইরে মাঝারি ও ছোট আকারের আরও ৩৫টি পয়েন্ট থেকে তা মিশছে লেকে।
বারিধারা ডিওএইচএস, কালাচাঁদপুর, বনানী ১১৮ নম্বর রোড, ন্যাম ভিলার দক্ষিণে বনানী ২ নম্বর রোড, মহাখালী-গুলশান লিংক রোড, গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড, বনানী ১১ নম্বর ব্রিজের নিচ এবং কড়াইল লেকসংলগ্ন বস্তি এলাকায় অনেক নালার মাধ্যমে মানুষের মলমূত্রসহ বিভিন্ন আবর্জনা মিশছে লেকের পানিতে। কড়াইল বস্তি এলাকায় অনেক টয়লেটের সরাসরি সংযোগ রয়েছে লেকের সঙ্গে। এসব সংযোগ বন্ধ করার ক্ষেত্রে ঢাকা ওয়াসা বরাবরই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার গুলশান লেক দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী আখতারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, ‘গুলশান লেক নিয়ে ওয়াসার প্রকল্পের কাজ আরও আগেই শেষ হয়েছে।’ কাজ শেষ হলেও লেকের পয়ঃবর্জ্য সংযোগ বন্ধ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা যতগুলো সংযোগ পেয়েছি সব বন্ধ করেছি। এখন নতুন করে সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বিমানে উঠার পর দেশবাসীর কাছে দোয়া চাইলেন নাসির

স্পোর্টস ডেস্ক: ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অংশ নিতে বুধবার রাত ১১.১৫টায় ...

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেছেন বাংলাদেশ সফররত ...