Home | ব্রেকিং নিউজ | চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজেই রোগী! চিকিৎসা সেবা চরম ব্যাহত

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজেই রোগী! চিকিৎসা সেবা চরম ব্যাহত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার : কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলছে প্রতিনিয়ত রোগীদের হয়রানি আর দূর্ভোগ। ৫০ শষ্যা বিশিষ্ট সরকারী হাসপাতালটিতে চিকিৎসা সেবা মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন এ হাসপাতালে উপজেলার ১ টি পৌরসভাসহ ১৮ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে সেবা নিতে আসা রোগীরা সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাছাড়া হাসপাতালের বেডগুলো নোংরা অপরিস্কার অপরিচ্ছন্নতায় ভরা। রোগীদের খাবারের জন্য বরাদ্দ দেয়া অর্থ হাসপাতাল কতৃপক্ষের যোগসাজশে চলছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারের রোগীদেরকে অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের অভিযোগও রয়েছে । হাসপাতালের বড় কর্তা যেন সব কিছু জেনেও রহস্যজনক নীরবতা পালন করছেন।

বর্তমান সরকারে চিকিৎসা খাতে যে উন্নয়ন করেছেন; তা চকরিয়া হাসপাতালের কয়েকজন ডাক্তারই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের মোট কার্যপরিচালনার পদ সংখ্যা ৩৯ জন হলেও বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন ১১ জন। তৎমধ্য ২ জন প্রশাসনিক কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছেন। এদের মধ্যে একজন হাসপাতাল ইনচার্জ ডাঃ শাহবাজ অন্যজন যাবতীয় কার্যক্রম দেখভাল এর দায়িত্বে আবাসিক মেডিকেল অফিসা (আরএমও) ডাঃ শোভন দত্ত। আর ৯ জন ডাক্তারের মধ্যে আছে ৪ জন। তারা হলেন, মেডিকেল অফিসার ডাঃ তোফাজ্জল হোসেন, ডাঃ উম্মে কুলসুম ও মোস্তাফিজুর রহমান। কনস্যালটেন্ট রয়েছেন ৫ জন। এদের মধ্যে ডাঃ মর্তুজা রেনু, ডাঃ খালেদ হোসেন, ডাঃ মুজিবুল হক, ডাঃ একরামুল হোসেন, ডাঃ শামস তারেক।

উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের জন্য ১৮ জন ও পৌর শহরের জন্য ৭ জন ডাক্টারের পদ রয়েছে। ৩৩ তম বিসিএস পরীক্ষার পর একসাথে ১৪ জন মেডিকেল অফিসারকে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য পোষ্টিং দেয়া হয়েছিল। হাসপাতালে ২০১৪ সালেও ছিল আসন সংখ্যা অনুযায়ী পরিপূর্ণ। কিন্তুু এর পরবর্তী সময়ে আসন সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে, যার পিছনে রয়েছে এক গোপন রহস্য। সে রহস্যজট নিবারণে মাথাব্যাথা প্রশাসনিক দায়িত্ববোধ কারো কাছে নেই।

সরজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালে লাগোয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো পরিনত হয়েছে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের প্রাইভেট চিকিৎসার নিরাপদ স্থান। রোগিরা সরকারী হাসপাতালের সুচিকিৎসা না পাওয়ায় ভিড় জমাচ্ছে সরকারী ডাক্তারদের প্রাইভেট চেম্বারে।

সরকারী ভাবে বরাদ্দ দেয়া মুল্যবান ওষুধ গুলো ভাগ্যে জুটেনা রোগীদের। সরকারী বেঁধে দেয়া নিয়ম অনুসারে সকাল ৮ টা থেকে বিকাল ২:৩০ টা পর্যন্ত ডাক্তারদের হাসপাতালে আগত রোগী দেখার নিয়ম থাকলেও তা এখানে হয়না। প্রতিদিন মূল পিক আওয়ার টাইম ১০-১২টা পর্যন্ত ডাক্টারগণ প্রাইভেট ক্লিনিকে ব্যস্ত থাকেন। ওই সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ।

রোগী ও রোগীর স্বজনরা জানান, শুধুমাত্র সরকার দেয়া বেতন ভাতা ও সুবিধা গুলো হালাল করতে কয়েক ঘন্টা সময় হাসপাতালে ঘুরেফিওে কাটিয়ে তারা ব্যক্তিগত চেম্বারে প্রাইভেট রোগি দেখার কাজে ব্যস্ত থাকেন।

এই সরকারী হাসপাতালের নানান অনিয়ম ও দূর্নীতির ব্যাপারে সরেজমিনে তদন্ত করে সচেতন নাগরিক কমিটি বহুবার প্রতিবেদন দিলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ এ পর্যন্ত কোন আইনি ব্যবস্থা নেয়নি।

বিভিন্ন সুত্রে প্রাপ্ত অভিযোগে জানা যায়, সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা সনদ ব্যবসা এখন ওপেন সিক্রেট। রোগী উপস্থিত না হলেও টাকা দিলে জরুরী বিভাগের টোকেন মিলছে। আর রেজিষ্ট্রার খাতায় ইচ্ছে মতো জখম লেখানো যাচ্ছে। এ উপজেলায় জায়গা জমি জমার বিরোধসহ সামাজিক নানা ঘটনা-দূর্ঘটনায় দ্বারস্থ হতে হয় ডাক্তারদের। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জরুরী বিভাগে কর্তব্যরত ডাক্তাররা মিথ্যা জখমী সনদ প্রদান করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। এ কারণে থানা ও আদালতে মিথ্যে মামলার সংখ্যা দিনদিন আশংকা জনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ হাসপাতালে নিয়োজিত ডাক্তারদের মধ্যে বেশীর ভাগই দীর্ঘকাল ধরে কর্মরর্ত থাকায় হাসপাতালটি তাদের পৈত্রিক জমিদারী মল্লুকে পরিনত হয়েছে। ডাক্তারা অফিস চলাকালীন সময়েও প্রাইভেট চেম্বারে বসে রোগী দেখার কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। আবার কয়েকজন ডাক্তার স্থানীয় হওয়ার সুবাদে তাদেও দাপটও অনেক বেশি। তারা দাপট দেখিয়ে অফিস চলাকালীন সময় বিভিন্ন ক্লিনিকে রোগী দেখতে চলে যান।

এদিকে হাসপাতালে ডাক্তারের রুমের সামনে দরিদ্র রোগীরা ঘন্টার পর ঘন্টা দীর্ঘলাইনে দাড়িয়ে থাকার পরও চিকিৎসকদেও দেখা পান না। অনেকে সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে দেখা গেছে।

হাসপাতালে আগত রোগীসহ চকরিয়ার সাড়ে ছয় লাখ মানুষের নিত্য দিনের এসব অভিযোগ।

সরেজমিন দেখা গেছে, বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের দীর্ঘ লাইন কিন্তু দেখা নেই কোন ডাক্তারের? যেখানে বসে ডাক্তাররা রোগীর সেবা দিবেন, সেই সব ডাক্তার কক্ষে তালা ঝুলানো। শুধু মাত্র তিনটি রুমে দাঁতের ও গাইনী ডাক্তার বসে সব রোগীদের কিছু প্যারাসিট্যামল, নাপা, গ্যাস্টিকের ঔষুধ লিখে দিয়ে বিদায় করে দিচ্ছেন। দীর্ঘ লাইনে দাড়ানো রোগীদের কাছে জানাতে চাইলে তারা বলেন, তালা বদ্ধ রুমের ডাক্তারা গেল কোথায়? উত্তরে সবাই বলেন, সকাল থেকে আমরা দাঁড়িয়ে আছি এখানে, কোন ডাক্তার এসে রোগী দেখেনি শুধুমাত্র দুইটি রুমে গাইনী ও ডেন্টাল ডাক্তার দিয়ে সব রোগের সেবা দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডাক্তার নাই, রোগীর দীর্ঘ লাইন! এরা চিকিৎসা করবে কিভাবে?

প্রতি উত্তরে বলেন, এখন প্রতিদিনই এরকম হয়, আমরা প্রতিবাদ করলে বদলী করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। তাই আমরা দেখেও চুপ করে থাকি। সরকার নিযুক্ত ৭/৮জন কনসালটেন্ট প্রতিদিন রোগী দেখার নিয়ম থাকলেও এখানে একজন গাইনী কনসালটেন্ট ছাড়া বাকীরা আসেন সপ্তাহে ১দিন। আবার কেউ কেউ দেড় দিন। হাসপাতালের মূল ইনচার্জ (টিএইচ) দায়িত্বে যিনি আছেন তারও প্রতিদিনই হাসপাতালে উপস্থিত থাকার কথা, কিন্তু তিনিও হাসপাতালে আসেন সপ্তাহে ২/৩দিন।

এই যদি হয় চকরিয়ার মত বিশাল এলাকার একটা সরকারী হাসপাতালের নিত্যদিনের চিত্র। তাহলে সরকার এখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে নতুন ভবন, ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করে সাধারণ জনগণের লাভটা কি হলো?

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, জনগণের লাভ না হলেও হাসপাতালকে জিম্মি করে রাখা কিছু দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আর কিছু ডাক্তারের ব্যবসা ঠিকই ভালো হচ্ছে, তাদের কাছে জনগণ আজ জিম্মি। কারণ তাঁদের মুল উদ্দেশ্যে গরীব রোগীদের সেবা দেওয়া নয়; তারা প্রতিযোগীতায় টাকা আয় করে পকেট ভারী করাই তাদের রুটিন মাফিক কাজ।

সরকারী হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে ল্যাব ও ক্লিনিক। এসব ল্যাবে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে ডাক্তাররা কমিশন বাণিজ্য করেন। মাস শেষে ঔষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের বিভিন্ন দামী উপহার তো ডাক্তারদের জন্য আছেই। তাঁরা ডাক্তার! মানুষের প্রাণ বাঁচাবে নাকি নিজেদের ভোগ বিলাসিতা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, এটা সাধারণ মানুষের প্রশ্ন।

এখানে রোগীদের খাবার, গরীবের জন্য আসা সরকারী ঔষুধ সব কিছুর ভাগ হয়। সেবা নিতে আসা রোগীরা পড়ে আরো বিপদে কোন জখম রোগী আসলে তাকে সেলাই করলেও গজ বেন্ডিজের জন্য টাকা গুনতে হয়। তাহলে রোগী হাসপাতালেও নিরাপদ নয়।

হাসপাতাল ইনচার্জ (টিএইচ) ডাঃ শাহবাজ বলেন, হাসপাতাল তিনটি বিভাগে পরিচালিত হয়ে থাকে। বহিঃবিভাগ, জরুরী বিভাগ ও আবাসন বিভাগ। সে অনুসারে আমাদের পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই। স্বল্পসংখ্যক ডাক্তার দিয়ে তিনটি বিভাগ পরিচালনা করা অনেকটা দুঃসাধ্য। বেশ কয়েকবার অফিসিয়ালি উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নিকট অবহিত করার পরেও কোন সুরাহা হয়নি। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ডাক্তার অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

কক্সবাজার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডাঃ রফিউজ সালেহীনের কাছে উপরোক্ত বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি ঢাকায় মিটিংয়ে আছেন বলে ফোন কেটে দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

লালমনিরহাটে অটোরিক্সা ছিনতাইচক্রের ১১ সদস্য আটক

লালমনিরহাট প্রতিনিধি : লালমনিরহাটে ছিনতাই করা অটোরিক্সা বিক্রি করার সময় ছিনতাই চক্রের ...

ইউপিডিএফ-এর বিবৃতি বাঘাইছড়িতে নির্বাচন পরিচালনাকারী টিমের ওপর হামলার নিন্দা

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি : খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা বাঘাইছড়িতে নির্বাচন পরিচালনাকারী টিমের ওপর হামলার ...