ব্রেকিং নিউজ
Home | শিল্প সাহিত্য | ফিচার | ঘোড়াঘাট এক বেদনা বিধূর ইতিহাসের স্বাক্ষী

ঘোড়াঘাট এক বেদনা বিধূর ইতিহাসের স্বাক্ষী

ঘোড়াঘাট এক বেদনা বিধূর ইতিহাসের স্বাক্ষী। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের প্রাচীনতম পাথরের সেতু বর্তমান জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি পাথরঘাটায় অবস্থিত।লাইক কমেন্টস শেয়ার নয় সুযোগ পেলে পড়ুন।

#এম_আই_মিঠু।
ভাস্কর ও সংগীতশিল্পী।

জানার নেশা, দায়িত্ববোধ এবং কৌতুহল বসত বহুদিন অত্র অঞ্চল ঘুরে, গবেষকদের লেখা পড়ে- এবং দেশের বিভিন্ন জাদুঘর দর্শনে যতটুকু জেনেছি তার উপরে ভিত্তি করে এ লেখা। বিচ্ছিন্ন কিছু তথ্য ও বিবরণী সরকারি জেলা গেজেটিয়ারে পাওয়া যায়। ইতিহাস লিখনের ক্ষেত্রে তা অতি সামান্য। যে সব লেখক প্রতিবেদক উক্ত স্থান পরিদর্শক করে প্রতিবেদন লিপিবদ্ধ করে গেছেন তা ইতিহাস লেখনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয় তবে একেবারেই ফেলে দেয়ার ও নয়।
প্রাচিন ইতিহাসের নানা সুত্র থেকে যে তথ্য সংগৃহীত তাতে কাল থেকে মহাকাল সময়ের পট পরিবর্তন, ক্ষমতার দম্ভ, রাজনৈতিক উত্থান পতনে অতীতের ইতিবৃত্ত হারিয়ে এখন কেবলই ইতিকথা।

বাংলার বৃহত্তম দুর্গটি ঘোড়াঘাটেই রয়েছে। মোগল আমলে যতগুলো বিখ্যাত নগরী ছিল ঘোড়াঘাট একটি। দিনাজপুর জেলার বাংলাহিলি বর্তমান নাম (হাকিমপুর) উপজেলার পূর্ব দিকে মাত্র ২০ কিলোমিটার মেইন রাস্তায় পাশে এখনো ৫শ বছর মাথা উচু করে দারিয়ে রয়েছে একটি মসজিদ। √√
খরস্রোতা করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে এই নগরীর অবস্থান। মোগল আমলে সরকার ঘোড়াঘাটের প্রধান শাসক কেন্দ্র হিসেবে এর সমাধিত পরিচয় ছিল। প্রাচিন জনপদ রাজাবিরাট, পৌন্ড্র বর্ধন, কোটিবর্ষ, গৌড়, পান্ডুয়া এবং কৈলা শহরের পতনের পর গুপ্ত পাল, সেন যুগ অতিক্রম করে মোগল যুগে এসে ঘোড়াঘাটে নগরের অভূ্্যদয় ঘটে। মোগল অধিকার ভুক্ত হওয়ার আগেই পাঠান ও কাকশালরাই ছিল সর্বেসর্বা। পাঠানদের পুর্বে সুলতানী আমলে কামতা রাজ্যের দক্ষিন সীমান্ত এলাকার একটি ছোট দূর্গরুপে ঘোড়াঘাটের পরিচয় ছিল।
কিংবদন্তী থেকে জানা যায় রাজা বিরাটের ঘোড়ার পাল এখানে বাঁধা থাকতো বলে এ জায়গার নাম ঘোড়াঘাট হয়েছে।

ঘোড়াঘাটের উত্তরে চতরা হাট এলাকার রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার অন্তর্গত (নীলগড়) রাজ্যের সীমানা ভুক্ত ছিল। সেখানে সেন বংশীয় রাজাদের আধিপত্য অটুট ছিল। সেন শাসনামলে রংপুরের দক্ষিনাঞ্চল ( চতরা হাট) সেন শাসন মুক্ত হয়।

প্রাচীনকালে ঘোড়াঘাট কোন রাজার অধীনে শাসিত হয়েছে সঠিকভাবে তা জানা যায়নি। তবে মহাভারতীয় যুগে (প্রায় ৫-হাজার বছর আগে) এই ক্ষুদ্র জনপদ মৎস্য দেশের রাজধানী ছিল ঘোড়াঘাট থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে ‘বিরাট’ নামক জায়গায়। মহাভারতের কাহিনীতে বলা হয়েছে, রাজা বিরাটের রাজ সভায় পঞ্চ পান্ডবেরা দ্রৌপদীসহ ছদ্দবেশে ১২ বছর নির্বাসনের এক বছর অজ্ঞাত বাস করেছেন।√♥

?পান্ডব গণ ছদ্মবেশে রাজা বিরাটের রাজবাড়িতে কর্মচারী হিসেবে কাজ করে। তাদের চালচলনের সন্দেহ হলে জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। রাজা তাদের আচরণে মুগ্ধ হন এবং পরবর্তীতে কৌরবদের সাথে যুদ্ধ পান্ডবদের পক্ষে রাজা বিরাট অংশ গ্রহণ করেছিলেন। যদিও সে যুদ্ধে রাজাবিরাট ও তার পুত্র উত্তর মারা যান। যুদ্ধের পরে মৎস্যদেশের চরম ভাগ্যবিপর্যয় দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে কে এই জনপদের রাজা হন তা জানা যায় নাই ইতিহাস কিংবা অন্য কোন বিবরনী থেকে।
ধারনা করা যায়, ঘোড়াঘাটের দক্ষিণে বোগদহ-সাহেবগঞ্জ পাঁচবিবি ও তার আশেপাশের এলাকায় একটি জনপদ ছিল। সেখানকার মাটির গভীরে প্রাচীন সমাজ সভ্যতার পরিচয়বাহী দীঘি-পুকুর, দালান-বাড়ি ও বৌদ্ধকীর্তির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। স্থানটি নরেঙ্গা রাজার রাজধানী ছিল বলে কোন কোন বিবরনী পাওয়া যায়।
খুব সম্ভব বিরাট রাজার পতনের পরে ঘোড়াঘাট এই নরেঙ্গা রাজ্যের অধীনে শাসিত হয়েছে। তবে সে শাসনের কোন বিবরণ নেই। এখনো ঐ স্থানটি নরেঙ্গাবাদ নামেই খ্যাত। সেখানে উক্ত নামে একটি ডাকঘরও আছে। বর্তমানে ঐ স্থানটি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানাধীন। ঘোড়াঘাট -গোবিন্দগঞ্জ পাকা রাস্তার উভয় পাশে বড় বড় দীঘি পুকুর। পথিকদের দৃষ্টি আকর্ষন করে। দীঘিগুলোই এখন প্রাচীন সমাজ সভ্যতার স্বাক্ষী।√√

মৌর্য যুগঃ ( খ্রিঃ পূর্ব ৩২৪-১৮৫)
প্রাচীন ভারতবর্ষে ৬টি ভুক্তির মধ্যে পৌন্ড্রবর্ধন ভুক্তি একটি। ভুক্তি হলো তৎকালীন প্রদেশ সমতুল্য একটি বৃহৎ জনপদ। এই ভুক্তির কেন্দ্রস্থল ছিল বর্তমান বগুড়ার মহাস্থান গড়ে। এখান থেকেই মৌর্য সম্রাট অশোকের একটি শাসনলিপি প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে এ ধারণা পোষণ করেছেন ইতিহাসবিদগণ। মৌর্য শাসনলিপি প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে এ ধারনা পোষণ করেছেন ইতিহাসবীদ গণ।
মৌর্য শাসনকালে ঘোড়াঘাট পৌন্ডবর্ধন ভুক্তির অধীনে শাসিত হয়েছে এটা নিশ্চিত। করতোয়া নদীকেন্দ্রিক প্রাচীন কিরাদীয় সভ্যতার দুটি প্রধান কেন্দ্রের মধ্যে মহাস্থান গড়ের পরেই ছিল ঘোড়াঘাট ও তৎসন্নিহিত এলাকা। খুব সম্ভব এ অঞ্চলে কিরাদ ও নিষাদ জাতির লোকদের প্রাধান্য ছিল তৎকালে। তাদের হাতেই ঘোড়াঘাট এলাকাসমেত আশেপাশের এলাকার কৃষি কাজের সূচনা হয়। মৌর্য সম্রাট অশোকের সময় বৌদ্ধ ধর্মের পরিচয়বাহী একাধিক মঠ, বিহার ও স্ত্তপ-এর সন্ধান পাওয়া গেছে পৌন্ড্রবর্ধন সীমানার মধ্যে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ঘোড়াঘাটের দক্ষিণে সাহেবগঞ্জ এলাকার মাটির গভীরে প্রাচীন সভ্যতার পরিচয়বাহী নগরের অস্থিত্ব এখনো বিদ্যমান।√√
এ সভ্যতার নিদর্শন মৌর্য আমলের আগের বলে দাবি করা যায়। ঘোড়াঘাট মৌর্যযুগে পৌন্ড্রবর্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছিল, যা পরবর্তী গুপ্ত রাজাদের শাসনাধীনে চলে যায়√√

√গুপ্ত শাসন: (খ্রিঃ ৩য়- ৬৩৮ পর্যন্ত)
মৌর্য শাসনের পরে শুরু হয় গুপ্ত শাসন। তিনশত বছরের অধিক সময় গুপ্তশাসন বহাল ছিল। গুপ্তরাজারা ভাগিরথী নদীর পূর্ব দিকে রাজ্য বিস্ময় নজর দেন তৃতীয় শতাব্দীর পরে। তার আগে ভাগিরথী নদী ডিঙ্গিয়ে যারা এ অঞ্চলে আসতো প্রায়শ্চিত্ত না করে তাদের সমাজে নেয়া হতোনা। কিন্তু আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে ঐ প্রথা বা নিয়ম বেশী দিন টিকে থাকেনি। গুপ্ত রাজারাও ভাগিরথী নদীর পূর্বাঞ্চলে রাজ্য বিষয় মনোযোগী হন। তাদের রাজ্য বিষয় ধারাবাহিকতায় গুপ্ত রাজাদের বেশ কয়েকজন রাজা এ অঞ্চল শাসন করেছেন। তাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। গুপ্ত যুগের শেষের দিকে পৌন্ডবর্ধন ভূক্তির ৩টি বিষয়ের সন্ধান পাওয়া পাশ দিয়ে প্রবাহিত ‘কাটা যমুনা’ নদীর পশ্চিম তীর ছিল কোটিবর্ষ বিষয়ের পূর্ব সীমানা। এর কেন্দ্রস্থল ছিল
পশ্চিম বঙ্গের গঙ্গারামপুর থানায় । প্রাচীন কোটিবর্ষ বিষয়ের সীমানার মধ্যে দামোদপুর নামে একটি স্থানের পরিচয় পাওয়া যায় (ফুলবাড়ি রেল স্টেশন থেকে ১৩ কি.মি. পশ্চিমে।) আর একই নদীর পূর্বতীর থেকে পূর্ব দিকে করতোয়া নদীর পশ্চিম সীমানা পর্যন্ত ছিল পঞ্চনগরী বিষয়ের সীমানা। বর্তমান ফুলবাড়ি ,বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হিলি, পাঁচবিবি সহ ঘোড়াঘাট ছিল দূর অতীতে পঞ্চনগরী বিষয়ের সীমানাভূক্ত ছোট প্রাচীন জনপদ। কারণ, ঘোড়াঘাটের সীমানার দামোদপুর নামে দ্বিতীয় আর একটি প্রাচীন জনপদ আছে। যা দক্ষিণ দামোদরপুর গুপ্তবংশীয় রাজা তৃতীয় কুমার গুপ্তের পুত্র দামোদর গুপ্তের সাক্ষ্য বহন করছে। উভয় জায়গায় পুরাতন দিঘী-পুকুরের অস্তিত্ব এখনো রয়েছে। ঘোড়াঘাটের দামোদরপুরে আজ পর্যন্ত কোন গুপ্তবংশীয় রাজার তাম্রলিপি আবিস্কার না হলেও ১৯১৫ সালে ফুলবাড়ীর দামোদরপুর থেকে ৫টি তাম্রলিপি আবিস্কার হয়।

√পাঁচটি তাম্রলিপির একটি দামোদর গুপ্ত কর্তৃক ২১৪ গুপ্ত সনে (৫৪৩ খ্রি:) উৎকীর্ণ । এটি কোটিবর্ষ নগরীর সচিবালয় থেকে জারি হয়েছে। ঐ সময় পৌন্ডবর্ধন ভূক্তির ভূক্ত্যপরিক বা প্রদেশপাল ছিলেন মহারাজ দেবভট্টরক। এখানে আরও উল্লেখ্য, পলাশবৃন্দ কেন্দ্রস্থল বর্তমান গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বলে কোন কোন গবেষক ধারণা করেন।
গুপ্ত সম্রাটদের শাসনকালে পৌন্ড্রবর্ধন ভুক্তির সীমানা উত্তরে হিমালয় পর্বতের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে পদ্মাতীর পর্যন্ত বিসৃত ছিল।

সে হিসেবে পলাশবাড়ী ও ঘোড়াঘাট উল্লেখিত সীমানার মধ্যেই ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। তখন হয়তো ঘোড়াঘাটের দামোদরপুরে গুপ্তরাজাদের একটি স্থানীয় ছোট শাসন কেন্দ্র ছিল যা পরবর্তীকালে গুরুত্ব হারিয়ে ফেললে অন্যত্র প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
বুলাকীপুর ইউনিয়নের একবটি মৌজা এই দামোদরপুর। সেখানে প্রায় কাছাকাছি ৪/৬ টি দীঘি আছে। এখানো দীঘিগুলো আশেপাশে বসত গড়ে ওঠেনি।

√প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ১৯৩০ সালের হিলির বৈগ্রাম থেকে প্রথম কুমার গুপ্তের যে তাম্রলিপি আবিষ্কার হয়েছে তাতে পলাশবৃন্দক ও পুরাণবৃন্দকহরি স্থানের নাম পাওয়া যায়। আলোচ্য ঘোড়াঘাটের আশেপাশে পালশা ও শ্রী হরি বিহারী নামে দুটি মৌজা আছে। উভয় স্থানে পুরাকীর্তির চিহ্ন বিদ্যমান।
খুব সম্ভব তাম্রলিপির পলাশ বৃন্দক ও পুরাণবৃন্দকহরি নামের অপভ্রংশ। সেই গুপ্ত রাজাদের শাসনাকালে গড়ে ওঠা বৌদ্ধকীর্তি সমূহ ধ্বংস হয় গুপ্তবংশীয় রাজা শশাংখের আমলে।

৫৯৩-৬৩৮ খ্রিঃ পর্যন্ত রাজা (শশাংখের) রাজত্বকাল। তার রাজধানী ছিল বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার কর্ণসুবর্ণে। তার রাজ্য গৌড় রাজ্য বলে পরিচিত ছিল এবং তিনি বৌদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন। তার অত্যাচারে ঘোড়াঘাটের আশেপাশে গড়ে ওঠা বৌদ্ধকীর্তিসমূহ ধ্বংস হয়ে যায়। তার অত্যাচারেই ঘোড়াঘাটের দক্ষিণে বোগদহ সাহেবগঞ্জ এলাকার ( বর্তমানে গাইবান্ধা জেলার অন্তর্গত) বৌদ্ধ সভ্যতার পরিচয়বাহী নগর ও উপাসনালসমূহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সমসাময়িক কালে বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী কামরুপের রাজা ভাস্করবর্মা কনৌজ অধিপতি হর্ষবর্ধনের সাথে মিত্রতাসুত্রে আবদ্ধ হয়ে উত্তর দিক থেকে গৌড়রাজা আক্রমণ করে। এতে

??৬৩৮ খ্রিঃ এর যুদ্ধে (গৌড়রাজ শশাংক) পরাজিত ও নিহত হয়। কিছু দিনের জন্য সমুদয় পৌন্ড্রবর্ধন অঞ্চল ভাস্করবর্মার শাসনাধীনে চলে যায়। বলতে গেলে গুপ্তদের শাসন এখান থেকেই শেষ হয়।

√√পাল শাসন-(৭৫৫-১১৭৫ খ্রিঃ)
ঘোড়াঘাটের পালশা, গোপালপুর, পলশারাজ, বেলওয়া, পাঁচবিবি উপজেলার পাথরঘাটায় পাল রাজাদের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে যা এখনো চোখে পড়ে।
পালরা ক্ষমতায় ছিলেন প্রায় ৪০০ বছর।
পালরাজা গোপাল ?মাৎস্যন্যায় যুগের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে কতিপয় আমত্য ও ছোট রাজাদের পরামর্শে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। পরে গুপ্তদের প্রশাসনিক ও রাজস্ব এলাকাকে অক্ষুন্ন রেখে প্রথম দিকে পৌন্ডবর্ধন নগরীতেই রাজ্যর কেন্দ্রস্থল হিসেবে গড়ে তোলেন রাজধানী। সেখানে রাজধানী হলেও ঘোড়াঘাট তার পার্শ্ববর্তী জনরুপে শাসিত হয়েছে সুদীর্ঘকাল। পালদের এলাকা বরেন্দ্র ভূমিকে জনক ভূ হিসেবে দাবি করতেন। অথ্যাৎ পিতৃভূমি।
ঘোড়াঘাটের মোট ভূমির প্রায় ৬৫ ভাগ লাল বরেন্দ্র ভূমি। প্রথম (রাজা গোপালের)‌‌ মৃত্যুর পরে পুত্র (ধর্মপাল) ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তার সময় পাল রাজ্যের যেমন বিসৃতি ঘটে তেমনি বৌদ্ধ ধর্মেরও বেশ উন্নতি হয়। তিনি পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, বিক্রমশীলা বৌদ্ধ বিহার ও কুমিল্লা জেলার ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৯৪৬ ইং সালে বামনদীঘির দক্ষিণপাড়ে বসবাসকারী খাড়ে সাঁওতালের উঠোন থেকে চুলা খনন কালে দেড় ফুট মাটির নিচে ২টি তাম্রলিপি আবিষ্কার হয়। তার একটি ছিল পাঁচবিবি পাথর ঘাটা অঞ্চলের শাসক রাজা মহীপালের। ( ৯৮৮-১০৩৮ খ্রিঃ ) এবং অপরটি ছিল পৌত্র (তৃতীয়) বিগ্রহ পাল এর (১০৫৫-১০৭০ খ্রিঃ )। প্রথম মহিপালের তাম্রলিপি দ্বারা তার পঞ্চম বিস্ময় অন্তর্গত পুন্ডলিকা, পৌন্ডবর্ধন ভুক্তির পঞ্চনগরী বিষয়ের অন্তর্গত পুন্ডরিকা মন্ডলিস্থ ফাণিতবীথির অধীন ৩ খানা গ্রাম দান করেন। দান গ্রহণ কারী ছিলেন হরিস দাস গোত্রের ব্রাহ্মণ জীবথ শর্মা এবং দানের কিছু অংশ ছিল গণেশ্বর সমেত গ্রাম পুস্করিনীর জন্য এবং এ প্রতিষ্ঠানের বিগ্রহের নাম ছিল গণেশ্বর। দ্বিতীয় তাম্রশাসন দ্বারা মহারাজা তৃতীয় বিগ্রহপাল কর্তৃক প্রথম মহীপালের তাম্রশাসনে যে লক্ষ্ণীন্দর দূতক এর নাম উল্লেখ আছে সেই সুত্র ধরেই এ অঞ্চল বহুল প্রচার লাভ করেছে ‘ বেহুলা লখীন্দরের’ উপাখ্যান। ঐ সময় ঘোড়াঘাটের উত্তরে নবাবগঞ্জ থানা সীমানায় মাহমুদপুর ইউনিয়নের চকজুনিদ পালদের একটি টাকশাল ছিল মর্মে জানা যায়।
ঐ স্থানটি বেহুলার বাসর ঘর নামে অবহিত। খুব সম্ভব বেলওয়া নামক স্থানে পালদের পুন্ডরিকা মন্ডলের সাথে নবাবগঞ্জের ছোট শাসন কেন্দ্রের সর্ম্পক ছিল যা উপরে বর্ণিত তাম্রলিপির পাঠ থেকে জানা যায়। তৎকালে এ অঞ্চল হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্টি ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও বসবাস করতো বলে ঐ দুটি তাম্রশাসন আমাদেরকে জানিয়ে দেয়। চকজুনিদ এলাকার পাল আমলের একাধিক নির্দশনের ধ্বংসাবশেষ এখানো বিদ্যমান।
২০০৭ সালে সেখানকার কালাদূর্গীর ধাপ (ঢিপি) আংশিক খননের পরে সেটি বৌদ্ধকীর্তি বলে চিহ্নিত হয়েছে।

√সেন আমলঃ ( ১১৬২-১২০৩ খ্রিঃ)
সেনগণ সম্ভবত চালুক্য রাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের সঙ্গে বঙ্গদেশে আসেন এবং পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের প্রথমে বসবাস আরম্ভ করেন। প্রথম দিকে তারা পালদের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন । পাল বংশের দূর্বলতার সুযোগে একাদশ শতাব্দীতে সামমত্ম সেন ও তার পুত্র হেমমত্ম সেন পশ্চিমবঙ্গে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য স্থাপন করেন।
সেন রাজারা হলেন সামমন্ত সেন, হেমমত্ম সেন, বিজয় সেন, বল্লাম সেন, লক্ষণ সেন, পুত্র বিশ্ব সেন ও কেশব সেন সহ ৭ জন রাজা। তাদের রাজধানী ছিল গৌড়ের লক্ষ্ণণাবতীতে। রাজা বিজয় সেনের মৃত্যুর পরে (১১৫৮) খ্রিঃ বৌদ্ধ ও হিন্দু নাগরিকগণ সেন শাসনে চরম অত্যাচারে জীবন বাঁচাতে চীন, তিববত, নেপাল, প্রভৃতি দেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সে সময় ঘোড়াঘাট অঞ্চলের বৌদ্ধকীর্তি সমূহ পরিত্যক্ত হয়। লক্ষ্ণণ সেনের সময় তার রাজ্যের পূর্ব সীমানা পূর্বদিকে ( কামরম্নপের অংশ ব্যতীত )
ঘোড়াঘাট সহ ঢাকার সোনারগাঁ পর্যন্ত বিসত্মৃত ছিল।

√ঘোড়াঘাটের উত্তরে চতরা হাট এলাকার রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার অন্তর্গত (নীলগড়) রাজ্যের সীমানা ভুক্ত ছিল। সেখানে সেন বংশীয় রাজাদের আধিপত্য অটুট ছিল। সেন শাসনামলে রংপুরের দক্ষিনাঞ্চল (চতরা হাট) সেন শাসন মুক্ত হয়। এরপর হোসেন শাহ কামতেশ্বর রাজা নীলাম্বড় কে পরাজিত করেন সেই যুদ্ধে সেনাপতি ছিলেন পুত্র নশরত শাহ।

√√√ রাজা লক্ষনসেন এর রাজত্বের শেষ দিকে
১২০৩ খ্রিঃ মুসলিম তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী মাত্র ১৭ জন ঘোড়াসওয়ার সমেত অতর্কীতভাবে নগরী আক্রমণ করে রাজা লক্ষন সেনকে পূর্ববঙ্গে বিতাড়ন করে বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রথম মুসলিম রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন।

?তুর্কী শাসনঃ ( ১২০৩-১২২৭ খ্রিঃ)
তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন-বখতিয়ার খলজি ১২০৩ খ্রিঃ বরেন্দ্র বিজয়ের পরে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন গৌড়ের (লাখনৌতিতে) । বিজিত অঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে ৩টি বিভাগে ভাগ করে তিন জন শীর্ষস্থানীয় আমীরকে স্থানীয় শাসনকর্তা (মুকতা) হিসেবে প্রেরণ করেন। তখনকার দিনে প্রশাসনিক এই বিভাগগুলো ইকতা এবং ইকতার শাসনকর্তা নামে অভিহিত ছিল। ইকতাগুলো হলো লাখনৌতি, গঙ্গাতীর ও বরসৌলা। শেষোক্ত ‘বরসৌলা’ আইন ই- আকবরীতে সরকার ঘোড়াঘাটের অমত্মর্গত বরসৌলা এর সর্ম্পক থাকতে পারে বলে বর্ণিত হয়েছে।

??ঘোড়াঘাটের উত্তরে নবাবগঞ্জ এর ভাদুরিয়া বাজার থেকে আনুমানিক ২ কিলোমিটার পূর্ব দিকে রাস্তার ধারে বড়শৌলা নামে একটি গ্রাম আছে। গ্রামের আশেপাশে দীঘি পুকুর সহ কিছু পুরাকীর্তির চিহ্ন নজরে পড়ে। খুবসম্ভব বীরশালা ( সেনানিবাস) থেকে বরশৌলা নামটি উৎপত্তি (যদিও এটি কোন মৌজা নয়) এই বরশৌলায় বখতিয়ার এর পূর্বাঞ্চলীয় ইকতা ছিল বলে অনুমান করা যায়। এই স্থান থেকে উত্তর পূর্ব দিকে ৩ কিলোমিটার দূরে ( ভাদুরিয়ার উত্তরে) প্রাচীন হরিনাথপুর দূর্গের অবস্থান । এই দূর্গের পূর্ব দিকেই বখতিয়ারের ইকতা ছিল বলে তা স্থানের নাম ও আশেপাশের পুরাকীর্তির দৃষ্টে অনুমান করা যায়। বখতিয়ারের বিজিত অঞ্চলের পূর্ব সীমানা যে করতোয়া নদী পর্যন্ত বিসৃত ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। এই বরশৌলা ইকতার উত্তর সীমানা নির্দেশ করা যায় নবাবগঞ্জ থানার উত্তর পূর্ব সীমানায় ভোটারপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ঘিরনাই নদী। ঘিরনাইয়ের উত্তরপাড়ে বর্তমান রংপুর জেলার অন্তর্গত হলেও অতীতে কামরুপ রাজ্যের সীমানাভুক্ত ছিল। সমগ্র পাবর্তীপুর , নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, ফুলবাড়ী, হাকিমপুর (কাটা যমুনার পূর্বপাড়) , ঘোড়াঘাট এবং পাঁচবিবি থেকে পূর্বদিকে শেলর্ষ ( বগুড়া) পরগণার অংশ বিশেষ নিয়ে বরশৌলা ইকতার সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল বলে অনুমান করা যায়। যার কেন্দ্রস্থল ঘোড়াঘাট এর উপকণ্ঠে বড়শৌলায় ছিল। এখান থেকেই সমগ্র ইকতা। এই ইকতার প্রথম শাসকর্তা ছিলেন বখতিয়ার খলজির অন্যতম আমীর আলীমর্দান খিলজি। তার সময়ে এ স্থান মর্দান কোট নামেই খ্যাত থাকলেও পরে ঘোড়াঘাট হিসেবেই সমধিক পরিচয় লাভ করে। বরশৌলা গ্রামের উত্তর পশ্চিম দিকে এবং পূর্ব দিকে কানাগাড়ী এলাকার বড় দীঘির চতুপাশে যে বিসত্মীর্ণ জমি রয়েছে সেখানেই আলীমর্দান খিলজীর সেনা ছাউনি ছিল এমনটা অনুমান করা যায়। যেহেতু ইকতার কেন্ত্র কোথায় ছিল তা এখনো সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়নি ইতিহাসের পাতায়। তাই এখানে ইকতা থাকার পক্ষে সম্ভাব্য স্থান নির্দেশ করা যায়।

ধারণা , কামতা রাজার আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যই এখানে ইকতার কেন্দ্র গড়ে তোলা হয। নিশ্চয় ঐ সময় ঘোড়াঘাটের গুরম্নত্ব সমর কৌশলীরা বুঝতে পেরেছিলেন। উল্লেখ্য ঘোড়াঘাটের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে করতোয়া নদীর পূর্বপাড়ে দশম শতাব্দীতে গড়ে উঠা বর্ধনকোট নগরীর কেন্দ্রস্থল ছিল গোবিন্দগঞ্জে। এটা কামরুপের সীমানাভুক্ত একটি জনপদ। কামরম্নপ রাজ্যের দ্বিতীয় আর একটি জনপদ ছিল ঘোড়াঘাটের কয়েক মাইল উত্তরে রংপুরের পীরগঞ্জ থানার চতরাহাটে। যা কামত্মদুয়ার নামে খ্যাত। এ ছাড়াও পূর্ববঙ্গে লক্ষ্ণণসেনের আক্রমণ ঠেকাতে সীমান্ত এলাকা ঘোড়াঘাটে আলীমর্দান খিলজি একটি দূর্গ স্থাপন করেন।

√√ নাসিরীয় ভাষ্য মতে ১২০৫ সালে বখতিয়ার খিলজি তিব্বত আভিযানে বের হন ১০ হাজার যোদ্ধা নিয়ে। তার বাহিনী বিশাল খরস্রোতা করতোয়া নদীর তীর ধরে ১০ দিনের পথ অতিক্রম করে (কামরম্নপ) সীমানায় পৌছে যায়।

১২০৬ সালে বখতিয়ার তিববত অভিযানে ব্যর্থ হন এবং বহু যোদ্ধা হারিয়ে অসুস্থ্য অবস্থায় দেবকোটে ফিরেযান। এর কয়েক দিন পরেই বরসৌলা ইকতার আমীর আলী মর্দান খিলজির হাতে বখতিয়ার খিলাজি নিহত হন। পরবর্তী আমীর গণ ১২২৭ খ্রিঃ পর্যন্ত তুর্কী শাসন পরিচালনা করেন। এর পরে কত দিন পর্যন্ত ঘোড়াঘাট অঞ্চলে তুর্কীশাসন বহাল ছিল তা অজ্ঞাত।
এখানে উল্লেখ্য, তুর্কীশাসনের ফলে ঘোড়াঘাট বা বরসৌলা ইকতায় মুসলমান যোদ্ধা ও কর্মচারির আগমন ঘটেছিল নিশ্চয়। তারা সেনাচৌকির আশেপাশেই থাকতো। মুসলিম সুলতান প্রতিষ্ঠা হওয়ার নানা পেশার লোক তথা পীর, দরবেশ, আলেম, মওলানা ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারকদের আগমন ঘটে এ অঞ্চলে। তাদের মেহনতে এই অমুসলিম এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজ চলতে থাকে। ইসলাম প্রচারের এই ধারাবাহিকতা পরবর্তী সুলতানী আমলেও অব্যাহত ছিল। নও মুসলিমদের ধর্মীয় জ্ঞান দানের জন্য স্থানে স্থানে মসজিদ, মক্তব্য, মাদ্রাসা ও খানকা গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়।
এখানে ওখানে গড়ে ওঠে মুসলিম বসত। ফারিসত্মার ভাষ্য মতে বখতিয়ার খিলজী রংপুর দখল করে সেখানে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিহাসের এ কথা মেনে নিলে রংপুর বরসৌলা (ঘোড়াঘাট) ইকতার মধ্যে ছিল কোনই সন্দেহ নেই।

??সুলতানী আমলঃ (১২২৭-১৫৩৮ খ্রিঃ)
সুলতানী আমলে প্রায় ৪৫ জনের বেশি সংখ্যক সুলতান ঘোড়াঘাট অঞ্চলসহ বঙ্গ শাসন করেন। এরি মধ্যে বঙ্গ কখনো দিল্লির অধীনে আবার কখনো স্বাধীনভাবে শাসিত হয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অর্থাৎ ১২৫৫ সালে লক্ষ্ণণাবর্তীর তৎকালীন শাসনকর্তা মালিক ইখতিয়ার উদ্দিন ইউজবক (মঘিসউদ্দিন ইউজবক) ঘোড়াঘাটের করতোয়া নদী পার হয়েই কামরূপ রাজ্য আক্রমণ করেন। ১২৫৭ সালের এই অফিযানে তিনি বিপর্যয়ের সম্মুখিত হন।
পরবর্তী সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ এর সময় (১৪৩৫-১৪৫৯ খ্রিঃ) দিনাজপুর ভূ-ভাগের ঘোড়াঘাট অঞ্চল নাসিরাবাদ নামে পরিচিত লাভ করে। সেখানে তার একটি টাকশাল ছিল।
এর পরে নাসির উদ্দীনের পুত্র সুলতান রকনউদ্দিন বরবক শাহ ১৪৫৯-১৪৭৬ খ্রিঃ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তার সময়ে ঘোড়াঘাটে পূর্ব-উত্তর দিকে কামরূপের কামেশ্বর পদবীধারী রাজাদের আধিপত্য বজায় ছিল। প্রকাশ থাকে যে, এক সময় রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর তথা গোটা উত্তর বঙ্গই ঘোড়াঘাট নামে অভিহিত হতো। ( শেরপুরের ইতিহাস, অধ্যক্ষ মোঃ রোস্তম আলী) ১৯৯৯, পৃষ্টা- ১৫
কামরূপ রাজ্যের সীমান্ত এলাকার প্রজাগণ নদী পার হয়ে ঘোড়াঘাট এলাকায় প্রবেশ করে ফসল ও জান মালের ক্ষতি সাধন করতো। এমন অবস্থা দমনের উদ্দেশ্যে গৌড়ের সুলতান রকনউদ্দিন বরবক শাহ সেনাপতি ইসমাইল গাজীকে ঘোড়াঘাট অঞ্চলে প্রেরণ করেন। প্রথম দিকে নওগাঁর মাহিসমেত্মাষের যুদ্ধে গাজী পরাজিত হয়ে দ্রম্নত সটকে পড়েন এবং ১২ জন পাইক নিয়ে ঘোড়াঘাট অঞ্চলে প্রবেশ করেন। এখানে তিনি প্রাচীন পরিত্যক্ত একটি গড়ে ১২ জন পাইক সহ অবস্থান করেন। এই বার পাইক থাকার কারণেই স্থানটির নাম বারপাইকের গড় হয়েছে। পরে সুযোগ বুঝে চতরাহাটের ‘নীলগড়ে’ বসবাসরত রাজা কামেশ্বরের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আরো জানা যায়, ঘোড়াঘাটের পশ্চিমে ডুগডুগী মোকাম থেকে যুদ্ধের ডুগডুগি বেজে উঠেছিল। এ জন্য পরবর্তী সময়ে সে স্থান ডুগডুগি মোকাম নামে পরিচিত হয়।
এখানেই পাইকপাড়া নামে এই মৌজা আছে। যুদ্ধের পাইক সেখানে থাকতেন বলে এ নামকরণ হয়েছে। ১৪৬০ সালে কামরূপের আংশিক বিজিত হয়েছিল গাজীর দ্বারা। গাজীই সর্বপ্রথম কৃতিত্বের অধিকারী যিনি কামরূপ-রংপুরের সেনবংশীয় রাজা কামেশ্বরকে পরাজিত করে প্রাচীন রংপুরকে মুসলিম সুলতানদের অধীনে আনেন। ইসলাম প্রচারের যে ধারা বখতিয়ারের আমলে শুরু হয় অনেকটা পূর্ণতা পায় শাহ ইসমাইল গাজীর আমলে। একই সাথে তিনি বিজিত অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তার চেষ্টায় কামরূপ ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলে ইসলামের বাণী প্রচারিত হয়। তার ধর্মানুরাগ, আচরণ ও কর্তব্য কাজে নব দীক্ষিত মুসলমানরা নব জীবনের সন্ধান পান। ক্রমে গাজীর সুনাম চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘোড়াঘাট দুর্গের অধিনায়ক ভান্দুসী রায় ঈর্ষান্বিত হন এবং সুলতানের আগে গিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক উক্তি করেন যে, গাজী কামরূপের পরাজিত রাজার সাথে আতাত করে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সুলতান এ সংবাদ অবগত হয়ে গাজীকে ধৃত করে শিরোচ্ছেদ করেন। গাজীর খন্ডিত মস্তক গৌড়ে সুলতানের দরবারে আনীত হয়। পরে সুলতান ভান্দুসী রায়ের ষড়যন্ত্র অবগত হয়ে গভীর অনুশোচনা করেন এবং শাহী সমাধি ক্ষেত্রে দাফনের ব্যবস্থা করেন। রংপুর, দিনাজপুর ও উড়িষ্যায় শাহ ইসমাইল গাজীর স্মৃতি বিজড়িত দরগাহ ও মাজার আছে। এর মধ্যে ঘোড়াঘাটের সাহেবগঞ্জ মৌজায় পাকা রাস্তার পশ্চিম ধারে ইসমাইল গাজীর একটি সমাধি আছে। এ ছাড়াও চতরাহাটের উপকন্ঠে কাঁটাদুয়ারে প্রধান সমাদি, পীরগঞ্জের বড়দরগা, পীরগাছার বড় দরগাহ ও উগিষ্যার গড় মান্দারণে ইসমাইল গাজীর সমাধি ও দরগাহ আছে। সুলতান রমকনউদ্দিন সমগ্র দিনাজপুর সহ গৌড়রাজ্য শাসন করে ১৪৭৬ খ্রিঃ মারা যান। এর পরে শুরু হয় হোসেন শাহী শাসন। তবে সেনবংশীয় রাজা নীলাম্বর কামতা রাজ্যের শাসক ছিলেন এ সময়। তার আমলে ঘোড়াঘাট ও রংপুরের একাধিক প্রতিরক্ষামূলক দুর্গ নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হয়েছিল।

?সম্রাট শের শাহের আমলে ১৪৭২-১৫৪৫ খৃঃ এসে সরকার ঘোড়াঘাট হিসেবেই প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সম্ভবত তখন থেকেই এই নগরী ধীরেধীরে গড়ে উঠে।
শের শাহের আমলে পাটগানরা এ জায়গায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তারা বিভিন্ন জায়গীর লাভ করে। এক সময়ে তারা ক্রমশ হয়ে উঠে সম্পদশালী এবং সাহস ও দক্ষতায় শক্তিশালী। পাঠানদের একচ্ছত্র আধিপত্য বেশিদিন টিকে থাকেনি।
উপর্যুপুরি মোগল আগ্রাসনে।

?১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিঃ পর্যন্ত আলাউদ্দিন হোসেন শাহ গৌড়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি সমগ্র বাংলার বাইরেও আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। হোসেন শাহ এর আমলে দিনাজপুর জেলার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরবর্তী কিছু এলাকা কামতা রাজ্যের অধীনে ছিল। তার রাজাছিলেন কামতেশ্বর উপাধিধারী সেন বংশীয় রাজারা। তাদের দক্ষিণাঞ্চলী রাজধানী ছিল ঘোড়াঘাটের কয়েক মাইল উত্তরে চতরাহাটের উপকন্ঠে নীলগড়ে। জানা যায়, এই ঘোড়াঘাট থেকেই হোসেন শাহ আসাম অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তিনি কামতেশ্বর রাজা নীলাম্বরকে পরিজিত (১৪৯৩ সালে) করে ঐসমস্থ এলাকা গৌড়রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেন। যুদ্ধের সেনাপতি ছিলেন পুত্র নশরত শাহ। হোসেন শাহ কুড়িগ্রাম জেলার ভিতরবন্দ এলাকা দখল করে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেন ৯১২ হিঃ ২২ জমাদিউল আউয়াল (১৫০৬ খ্রিঃ) তারিখে। তিনি কাটাদুয়ারে শাহ ইসমাইল গাজীর মাজার সংস্কার করেন এবং একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেন। ঘোড়াঘাটের পশ্চিম উত্তরে (হিলি রোডে) সহরগাছি মৌজায় একটি বড় দীঘির পাড়ে অবস্থিত সুরা মসজিদটি আলাউদ্দিন হুসেন শাহ এর আমলে নির্মিত বলে কোন কোন গবেষকদের ধারনা। এই সুলতানের আমলে খুরাসান অঞ্চলের তুরাবর্তী বংশের কাকশাল গোত্রের লোকজন এসে ঘোড়াঘাটে আবাসস্থল গড়ে তোলেন। সুলতান তাদেরকে এ অঞ্চলে জায়গীর প্রদান করে কামরূপ রাজ্যের যে কোন আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেন। সে সময় বরবক শাহ কর্তৃক নির্মিত দুর্গের সংস্কার সাধন করেছিলেন তিনি।

?এই সময় থেকেই ঘোড়াঘাটে কাকশাল গোত্রের লোকজনের প্রধান্য লাভ করে।

হোসেন শাহ গৌড়ে থাকলেও তিনি দুর্গ ও ছোট পাড়ুয়াতে মাঝে মাঝে অবস্থান করতেন। এই একডালা দুর্গের অবস্থান পাঁচবিবির কসবা নামক স্থানে। ঘোড়াঘাট থেকে ১৫ মাইল পশ্চিমে বলিহারি বা বর্তমান (বলাহার) গ্রাম। পালশা ইউনিয়নের পুড়ইল গ্রামটিকেই অতীতের পাড়ুয়া নামে অভিহিত করতে পারি। যেহুতু ঐ দুটি ঐতিহাসিক স্থান এখনো নির্ণিত হয়নি। হোসেন শাহের পরে পুত্র নশরত শাহ সিংহাসনে বসেন ১৫১৯ সালে। তার আমলে ঘোড়াঘাট শহরের সংস্কার সাধিত হয় এবং তার নামানুসারে এ স্থানের নামকরণ করেন নশরতাবাদ। সেখানে একটি টাকশাল স্থাপিত হয়। এই নশরতাবাদ টাকশাল থেকে ৯২৪ হিজরীতে মুদ্রা জারি হয়েছিল। খুবসম্ভব এ টাকশাল ছিল ঘোড়ঘাটের লালদহ বিলের মধ্যখানের স্থলভাগের উপরে। দঃ জয়বেদপুর মেওজায় চর্তুদিকে ? (পরিসংখ্যান) ? বেষ্টিত এক ভূখন্ড এখনো দৃষ্টিগোচর হয়। এমন সুরক্ষিত স্থানেই টাকশাল থাকা সম্ভব। নশরত শাহ এর আমলে আসাম আভিযান সাফল্যমন্ডিত হয় এবং আসামের রাঙ্গামাটি নামক স্থানে একটি ফৌজদার স্থাপিত হয়।

রাঙ্গামাটি বিজিত হওয়ার ফলে বিশাল এক ভূখন্ড নশরত শাহ এর শাসনাধীনে আসে। ১৫৩২ সালে নশরত শাহ মারা গেলে পুত্র ফিরোজ শাহ সিংহাসন লাভ করেন। তিনিও বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। তার চাচা গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ ক্ষমতা দখল করেন। তার আমলেও ঘোড়াঘাটের নশরতাবাদ টাকশাল অটুট ছিল।

?১৫৩৮ সালে পাঠান বীর শের খান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহকে পরাজিত করে বাংলা জয় করেন। এ সময় থেকেই বঙ্গে পাঠান রাজত্বের সূচনা হয়। ঘোড়াঘাট অঞ্চল পাঠানদের শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে পরবর্তী মোগল যুগ পর্যন্ত টিকে ছিল।

বলতে গেলে ঐ সময়ে ঘোড়াঘাট থেকেই পাঠানরা উত্তরে রংপুর, কামরূপ, আসাম ও ঢাকা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। যখন যে এলাকা দখলে এসেছে সেখান পাঠানরা জায়গীরদারী নিয়ে সলতানের পক্ষে কাজ করেছেন। গড়ে তুলেছেন মুসলিম স্থাপনা। এসমস্ত এলাকায় মসজিদ, মক্তব,খানকা ইত্যাদি নির্মানের মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজে পীর দরবেশ গণ দিবা রাত্রি পরিশ্রম এর মাধ্যমে সহায়তা করেন।

পাঠান আমলঃ (১৫৩৯-১৫৭৬ খ্রিঃ)
১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে শেরখান দিল্লীর মসনদে আরোহণ করেন। এর আগে তিনি শেরগড় দুর্গ অধিকার করে শেরশাহ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তখন বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন খিজির খান। বাংলা ছিল দিল্লীর অধীন। শেরশাহ শাসনতান্ত্রিক সুবিধার জন্য সমগ্র বাংলাকে ২৪টি শিক ও ৭৮৭ টি মহালে/পরগণায় (ছোট শাসন কেন্দ্র) বিভক্ত করেন। শিকগুলো সরকার নামেই পরিচিত ছিল। ১৫৩৮-৫৬ সালের মধ্যে বগুড়ার শেরপুরে একটি শিক ছিল। শিক এর শাসনকর্তা শিকদার নামে পরিচিত। পরে এ স্থান শেরপুর মুর্চা বা সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়।

?১৫৭৬ খৃঃ সম্রাট আকবরের সেনাপতি হোসেন কুলি খান এর সাথে যুদ্ধে বাংলার শেষ পাঠান সুলতান দাউদ খা পরাজিত ও নিহত হওয়ার পর গৌড় বাহিনীর পক্ষে যখন চরম হতাশা হওয়া ব্যতীত উপায়ন্তর ছিল না তখন মোগল সম্প্রসারণ গতির প্রতি পক্ষে ভাটি অঞ্চলের বার ভুইয়াদের অস্ত্রধারণ করার অদম্য মনোবলে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রথম মোগল বাহিনীর গতিরোধ করে দাড়ায় যারা-তারা ছিল ঘোড়াঘাটের লিখিত পাঠান শক্তি। গৌড় দখলের পর প্রাথমিক অবস্থায় বাংলায় মোগলদের কোন রাজধানী এমন কি স্থায়ী কোন সামরিক কেন্দ্র ছিল না। বিজিত গৌড় নগরী কে তারা রাজধানীরুপে গ্রহন করতেও পারেনি।

?১৫৪৯-১৫৯৮ খৃঃ এর কোন এক সময় ঘোড়াঘাট মোগল সাম্রাজ্য ভুক্ত হয়। টোওরমোলের (কাচারীর মত) রাজস্ব ব্যবস্থার অধীনে ৮৪টি পরগনা নিয়ে সরকার ঘোড়াঘাট (রূপে) আত্মপ্রকাশ করে। তখন থেকে মাঝারি ধরনের একটি দুর্গ এবং সরকারের প্রধান শাসন কেন্দ্র রূপে এই স্থানের গুরুত্ব বাড়তে থাকে।
সামসাময়িককালে গৌড়ের পূর্ব দিকে ঘোড়াঘাট একটি প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বিশেষ শুরুত্ব লাভ করে। উভয় স্থান করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। সুলতানী আমলে আগত কাকশাল ও পাঠনদের চেষ্টায় সমৃদ্ধ শালী জনপদে পরিণত হয় ঘোড়াঘাট। গৌড়ের একাধিক পাঠান সুলতান কামতা রাজ্যের আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রের প্রান্তসীমা রক্ষার জন্যে কতকগুলো পাঠান সরদারকে ঘোড়াঘাটে জায়গীর প্রদান করেন। শেরশাহের মৃত্যুর পরে তার পুত্র ও কয়েক জন সুর উপাধিধারী শাসকের নাম অবগত হওয়া যায় ইতিহাস থেকে। ঐ সময়ে পার্শ্ববর্তী কামরূপ রাজ্যের রাজাদের শ্যেন দৃষ্টি এ অঞ্চলের উপরে পড়ে। ঘোড়াঘাট থেকেই তা প্রতিহত করা হয়। ঐ সময়ের কোন নিদর্শন ঘোড়াঘাটের কোথাও টিকে নেই। এর পরে কররানী বংশের শাসন শুরু হয়। কররানী বংশের শাসকদের সাথে মোগলদের সর্ম্পকের অবনতি ঘটে। এতে উভয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই রাজমহলের যুদ্ধে দাউদখান কররানীর পতন ঘটে। মোগল শক্তির পক্ষ্যে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন সেনাপতি মুমিন খান। এ জন্য তিনি আকবরের নিকট থেকে খানে খানন উপাধি লাভ করেন। পাঠান শক্তির পতন শুরু হলেও ঘোড়াঘাট, শেরপুর পাবনার চাটমোহর এলাকাতে তাদের কর্তৃত্ব বহাল ছিল অনেক দিন। মোগল অভিযান প্রতিহত করার লক্ষ্যে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পাঠান দলপতিদের আক্রমণ অব্যাহত ছিল।

?(১৫৯৬ খৃঃ) রাজমহলের আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলার স্থায়ী রাজধানী স্থাপিত হওয়ার পূর্বে মোগলদের যতটুকু এলাকার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার শাসন কেন্দ্র ছিল ভ্রাম্যমাণ। এমন কি ঘোড়াঘাটের পাঠান যুদ্ধের সময় মোগলদের সেনাছাউনি ছিল ভ্রাম্যমাণ। ঘোড়াঘাট অতিক্রম না করা পর্যন্ত মোগল বাহিনীর পক্ষে ৫টি অঞ্চলের অর্থাৎ যমুনা নদীর পূর্ববর্তী
অঞ্চলে পাঠান পূনর্বাসন দ্বারা কলনী গড়ে তোলা হয়েছিল, অর্থাৎ সুলতানী আমলেই শুধু নয় মোগল আমলেও ঘোড়াঘাটে আফগান কলনী গড়ে তোলার নীতি অব্যাহত ছিল।
তাই ঘোড়াঘাটের প্রতিরোধ দূর্গ অতিক্রম করতে তাদেরকে চরম হেস্তনেস্ত হতে হয়। সম্মুখীন হতে হয় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বিগ্রহে। সেই সাথে মোগল রা ঘোড়াঘাটে মুসলিম জনশক্তি গঠননীতি ও সামরিক শক্তি সমাবেশের প্রতি গুরুত্ব দিতেন। অনেক গুলো খন্ড খন্ড যুদ্ধ হয়, যা স্থায়ী হয় ১০-১২ বছর।

?মোগল শাসনঃ (১৫৭৬-১৭২৭ খ্রিঃ)
সম্রাট বাবর মোগল সাম্রাজ্যের গোড়া পত্তন করলেও তার সময়ে রাজ্যের বিস্তৃতি ও স্থায়ীত্ব হয়নি। এর সামান্য উন্নতি লক্ষ্য করা যায় তার পুত্র হুমায়ুনের সময়ে। হুমায়ুনের মৃত্যুর পরে তার একমাত্র নাবালক পুত্র আকবর সিংহাসনের আরোহণ করেন। অল্প বয়স্ক আকবরের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বৈরাম খাঁ।

?গৌড় পতনের পর বাংলার সাম্রাজ্য বিস্তার করতে অগ্রসর হতে গিয়ে মোগল বাহিনীর প্রথম যে সামরিক বাধার সম্মুখীন হয় তা ছিল ঘোড়াঘাটের পাঠান শক্তি। কারণ গৌড় থেকে উত্তরবঙ্গের উপর দিয়ে ভাটি অঞ্চলের অগ্রসর হতে গেলে গৌড়েরপরেই পরে পাঠান শক্তি কেন্দ্র ঘোড়াঘাট পাঠান শক্তি। এখানে বহু পাঠান সর্দারের বসবাস ছিলো।
মজনু খাঁ, বাবা খাঁ, জাবেরী খাঁ প্রমুখ সর্দারগন এক একটি পাঠান গোত্রপতি ছিলেন। তাদের অনেক ধন সম্পদের পাশাপাশি আয়ত্বে ছিল বিরাট জনগোষ্ঠী। পুর্ববঙ্গের অর্থাৎ ভাটি অঞ্চলের বার ভুইয়াদের সংগে সংঘর্ষে লিপ্ত হবার পুর্বে একই কারনে মোগল বাহিনী স্বাধীন চেতা পাঠান বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়।

?গৌড়ের পতনের পর বাংলায় মোগল আগ্রাসনের ভবিষ্যৎ কি গতি নেবে ঘোড়াঘাটের রণাংঙ্গনেই সূচনা হয়েছিল তার প্রথম শক্তি পরিক্ষা। ঘোড়াঘাটের স্বাধীন চেতা জঙ্গীবাজ পাঠান সর্দারগণের সংঙ্গে মোগলদের বহু খন্ড খন্ড যুদ্ধ সংগঠিত হয়। ঘোড়াঘাটের স্বাধীনতার অস্তিত্ব রক্ষায় পাঠান সর্দারগণ যে শক্তি বিক্রম ও সামরিক কৌশলের পরিচয় দেয় তা ভাটি অঞ্চলের বার ভূইয়াদের মোটেও কম ছিল না। পাঠানদের গেরিলা নীতির যুদ্ধের গোলকধাঁধায় পড়ে মোগল বাহিনী দিকবিদিক জ্ঞান শুন্য হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বাংলার খাল বিল ঝিলে মোগল বাহিনীকে চরম বিপাকে পড়তে হয়। এমন কি মোগল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম বীর সেনাপতি রাজা মান সিংহ পর্যন্ত পাঠানদের ধকল সামলাতে না পেরে ঘোড়াঘাটের শিবিরে স্বাস্থ্য ভাংগা অবস্থায় দীর্ঘদিন রোগ ভোগ করেন।

?দিল্লিশ্বর আকবরকে পর্যন্ত বিচলিত করে তোলে ঘোড়াঘাটের রণাঙ্গনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কিন্তু প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ছলনায় মোগল যুদ্ধ নীতি কুটনীতিতে পরিণত হওয়ায় পাঠানদের যুদ্ধ তৎপরতা প্রতারিত হয়। বিশেষ করে সেই সংকট কালে কেন্দ্র কর্তৃক পাঠান সর্দারগনের জায়গীর দারী সনদ বাতিল হওয়ার ঘটনাটি চরম আঘাত হানে পাঠানদের আর্থিক মেরুদন্ডে। একই সাথে পাঠানরা মানসিক ক্ষেত্রেও দুর্বল হয়ে পড়তে বাধ্য হয়।
ফলে পাঠান শিবিরে খাদ্যভাব দেখা দেয়। নেতৃত্বের বিশৃংখলা দেখা দেয়। সৈনদের মধ্যেও হতাশার সুর ধরে।পাঠান বিদ্রোহের পরিনাম সুনিশ্চিত ব্যর্থতার দিকে চলে যায়। পরবর্তী মোগল অধিকার ভুক্ত হওয়ার পর আইন-ই-আকবরী থেকে জানা যায় সম্রাট আকবরের আমলে টোটরমলের রাজস্ব ব্যবস্থার অধীনে (১৫৮২খৃঃ) সমগ্র সবেহ বাংলায় যে ১৯টি সরকার (প্রশাসনিক এলাকা বর্তমান জেলা পর্যায়ের সমান) সৃষ্টি করা হয় তন্মধ্যে সরকার ঘোড়াঘাট অন্যতম একটি প্রশাসনিক ইউনিট ছিল। সরকার ঘোড়াঘাটের শুরু থেকে ইংরেজ ইংরেজ অধিকার পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বেশ কজন ফৌজদারের সুশাসনে সরকার ঘোড়াঘাটের প্রজা সাধারণ বেশ সুখ স্বাচ্ছন্দে ছিল। যতদুর জানা যায় মোগল ও নবাবী আমলে ঘোড়াঘাটের যে কজন ফৌজদার ছিলেন তন্মধ্যে প্রথম ফৌজদার সৈয়দ মোহাম্মদ খান এবং শেষ ফৌজদার ছিলেন কমর আলী খান প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০-১২ জন ফৌজদার ঘোড়াঘাটে ছিলেন। তাদের মধ্যে সৈয়দ মোহাম্মদ খান, মীর ইস্কান্দার খান, ইবাদত খান, মীর খসরুল্লাহ খান, মীর জবরদস্ত খান, মীর ইব্রাহীম খান, মীর সাহাদৎ আলী খান, মীর সামসুদ্দৌলা খান, মীর আলী কুলি খান, মীর লিয়াকত আলী খান, শেখ ইয়ার মোহাম্মদ খান, সৈয়দ আহম্মদ খান, হোসেন মোহাম্মদ খান, জয়নুল আবেদীন খান, কাশেম আলী খান ও মীর করম আলী খান প্রমুখ। উল্লেখ্য যোগ্য ফৌজদারের পদবী বর্তমান জেলা প্রশাসকের সমকক্ষ। ঘোড়াঘাটে যে কজন ফৌজদার ছিলেন তারা ধার্মিক ও সৎভাবে জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। এদের মধ্যে অনেকে সাহিত্যনুরাগী ও ছিলেন। শেষ ফৌজদার করম আলী খান মোজাফফর নামা লিখে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। সমসাময়িক কালে সাকের মাহমুদ ও কবি হায়াত মাহমুদের মত কবি সরকার ঘোড়াঘাটের অন্তর্গত। রিফাইতপুর ও ঝাড়বিশলা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তাদের রচনায় ঘোড়াঘাট সরকারের অনেক বিবরণ পাওয়া যায়। মধ্যযুগের এই দুজন কর্মী সর্বসাধারণের নিকট বিশেষ পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন এবং এখনো আছেন। মোগল আমলে ঘোড়াঘাট ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ইসলাম প্রচারে ও ধর্ম বিস্তারে ক’জন সাধক ব্যক্তির অবদানের কথা জানা যায়। তারা এখানকার বাসিন্দা ছিলেন। এদের মধ্যে মাওলানা বদরে উদ্দিন আরেফিন, যার মাজার ঘোড়াঘাট থানা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ চত্বরে। মাওলানা নুরুদ্দিন যার মাজার ঘোড়াঘাট বন্দরের পশ্চিম কোণে। দরিয়া ই-বোখারী যার মাজার করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত এছাড়া কাজী সদর উদ্দিন যার মাজার ঘোড়াঘাট বন্দরের উত্তর পাশে। এ স্থানের অনেক ইতিহাস এখন শুধুই ইতিহাস রয়ে গেছে। অনেক কিছু আর চোখে পড়ে না ঘোড়াঘাটের ইতিহাস এখন বেদনা বিধূর। দুঃখের বিষয় অনেক খোজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে লিখিত হয়নি এখানকার কোন অতীত বৃত্তান্ত।√√?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

জেলাবাসীর গৌরব হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ

বিডিটুডে ডেস্ক : চাঁদপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী জনপদের নাম হাজীগঞ্জ। এখানকার জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ মুসলমান। ...

পদ্মাতীরের ময়নাপাড়ার মাঠ

বিডিটুডে ডেস্ক : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজ থেকে প্রায় একশত উনিশ বছর আগে বর্ষাকালে, ...