ব্রেকিং নিউজ
Home | ব্রেকিং নিউজ | কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি; দুর্ভোগ চরমে, ৭ শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু

কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি; দুর্ভোগ চরমে, ৭ শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু

অনিরুদ্ধ রেজা, কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। বাড়ছে পানিবন্দি ও বন্যার পানিতে ডুবে নিহতের সংখ্যাও। সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ১১৭ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১২৪ সেন্টিমিটার এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যার পানিতে নৌকা ডুবির ঘটনায় ৪ শিশুসহ ৫ জন এবং বন্যার পানিতে ডুবে ৩ শিশুসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুর এলাকায় মঙ্গলবার বিকেলে নৌকা ডুবির ঘটনায় ৪ শিশুসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এঘটনায় আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে আরো ২জন।

নৌকা ডুবিতে নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো: হাফিজুর রহমান।

স্থানীয়রা জানায়, নতুন অনন্তপুর গ্রামের কয়েকজন মহিলা ১৪ থেকে ১৫জন শিশুকে নিয়ে একটি ডিঙ্গি নৌকায় করে বন্যার পানিতে ঘুরতে পার্শ্ববর্তী একটি বিলে যান। এসময় অতিরিক্ত ভারের কারনে বিলের পানিতে নৌকাটি ডুবে যায়। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখতে পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকে অবগত করে নৌকা নিয়ে তাদের উদ্ধার করতে যায়। এসময় তারা শিশুসহ কয়েকজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে উলিপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। হাসপাতালে পৌছানোর আগেই দুইজনের মৃত্যু হয়। আর এক শিশুর মা নিহত রুনা বেগম (৩৫) তার শিশু সন্তানকে বাঁচাতে নিজে পানিতে ডুবে দুই হাতে সন্তানকে পানির উপর ভাসিয়ে রাখেন। স্থানীয়রা তার শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও দীর্ঘক্ষন পানিতে ডুবে থাকা মা রুনাকে বাঁচাতে পারেনি। নিহত অপর ৪ শিশুরা হলেন, অনন্তপুর গ্রামের ব্যাপারীপাড়ার আয়নাল হকের পুত্র হাসিবুল (৭) একই গ্রামের মহসিন আলীর কন্যা রুপা মনি (৮), মনছুর আলীর পুত্র মোরসালিন সুমন (১০)এবং রাশেদের কন্যা শিশু রুকু মনি (৭)।

অন্যদিকে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও নাগেশ্বরী উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই যুবক নিখোঁজ হয়েছে। এদের মধ্যে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরেকজনের লাশ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাসহ স্থানীয় লোকজন পানির নিচে সম্ভাব্য স্থানগুলোতে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

নিখোঁজ যুবকেরা হলেন, রৌমারী উপজেলার চাক্তাবাড়ী গ্রামের আব্দুস ছালামের পুত্র সাইফুল ইসলাম (২৩) এবং নাগেশ্বরী উপজেলার কালিগঞ্জ ইউনিয়নের মাদাইখাল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আ.ন.ম মুসার পুত্র আল মামুন (৪০)।

নাগেশ্বরী থানার অফিসার ইনচার্জ রওশন কবির জানান, মাদাইখাল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আ.ন.ম মুসা সোমবার নিজে বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার বড় ছেলে আল মামুন নাগেশ্বরী উপজেলা শহর থেকে তার বাবাকে নিতে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেন। পথে বন্যার পানি ভেঙ্গে পায়ে হেটে যাওয়ায় সময় বাড়ির পাশে মাদাইখাল এলাকায় খাদে পড়ে নিখোঁজ হয়। পরে অনেক খোঁজাখুজির পর মঙ্গলবার দুপুর নাগেশ্বরী ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা পার্শ্ববর্তী জায়গা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে।

রৌমারী থানার অফিসার ইনচার্জ আবু মো: দিলওয়ার হাসান ইনাম জানান, রৌমারী উপজেলার চাক্তাবাড়ী এলাকায় বেরিবাঁধ ভেঙ্গে প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়ে। বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার পানিতে ঘর-বাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার সকালে সাইফুর ইসলাম বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কলা গাছের ভেলায় উঠিয়ে উঁচু স্থানের দিকে যাওয়ার সময় বিদ্যুতের তারের সাথে ধাক্কা লেগে পানিতে পড়ে যায়। এরপর স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের নিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার কোন সন্ধান পাননি।

স্থানীয়রা জানায়, অসাবধানতা বশত বন্যার পানিতে পড়ে গিয়ে এঘটনা ঘটেছে।

এছাড়াও গত রোববার ও সোমবার ২দিনে বন্যার পানিতে ডুবে চিলমারীতে ২ এবং উলিপুরে ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা: এসএম আমিনুল ইসলাম।

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ১১৭ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১২৪ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তার পানি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

এতে করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার ৯ উপজেলার ৫৬ ইউনিয়নের ৪০৭ টি গ্রাম। বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষ। বন্যা দুর্গত এলাকাগুলোতে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গো-খাদ্যের সংকট দেখা দেওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে বানভাসী মানুষজন।

চরাঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ ঘর-বাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী উঁচু বাঁধ ও পাকা সড়কসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে।

জেলা প্রশাসন থেকে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের কথা বলা হলেও বন্যা দুর্গত বেশির ভাগ মানুষ ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করেন।

কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো: হাফিজুর রহমান জানান, জেলার ৯ উপজেলায় বন্যার্তদের জন্য এখন পর্যন্ত ৫০০ মেট্রিক টন চাল, ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। যা বিতরন করা হচ্ছে। এছাড়া নতুন করে ১ হাজার মেট্রিক টন চাল, ২০ লাখ টাকা ও ১০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলার সকল সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ৮৫টি মেডিকেল টিম বন্যা বন্যার্তদের স্বাস্থ্য সেবার জন্য কাজ করছে।

অন্যাদিকে কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলাসহ সোনাহাট স্থল বন্দরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। পানির প্রবল তোরে রৌমারী উপজেলার চাক্তাবাড়ী এলাকায় প্রায় শহর রক্ষা বাঁধের প্রায় দেড়শ ফুট ধ্বসে যাওয়ার যাদুর চর ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী ৩০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

বন্যার পানি উঠার কারনে ৩৭২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৪৫টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে ৯ হাজার ৯শ ৪২ হেক্টর জমির সবজি বীজতলাসহ বিভিন্ন ফসল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

পুলিশকে বিপদের সময় মানুষের বন্ধু হতে হবে:প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রির্পোটার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পুলিশকে বিপদের সময় মানুষের বন্ধু ...

শোভন রাব্বানীকে সরিয়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাহিয়ান এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য

স্টাফ রির্পোটার : ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ ...