ব্রেকিং নিউজ
Home | জাতীয় | কাদের মোল্লার ফাঁসি

কাদের মোল্লার ফাঁসি

kader mollahস্টাফ রিপোর্টার : জামায়াতে ইসলামী নেতা মিরপুরের কসাই হিসেবে পরিচিত আব্দুল কাদের মোল্লার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের চূড়ান্ত রায়ে সর্বোচ্চ আদালত মঙ্গলবার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন।

এর আগে নিম্ন আদালতের তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগ আন্দোলনের পর সংশোধিত আপিল আইনের আওতায় গণহত্যার প্রমাণ মেলায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে কসাই কাদের নামে পরিচিত এই মানবতাবিরোধী অপরাধীর।

 

আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ আসামি পক্ষের আপিল আবেদন খারিজ করে দিয়ে প্রসিকিউশনের আপিল আবেদন গ্রহণ করে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।

 

রায়ের খবরে শাহবাগে উল্লাস প্রকাশ করে গণজাগরণ মঞ্চ। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আপিল বিভাগের এই রায় হয়।

 

রায়ে ৬ নম্বর অভিযোগে জামায়াত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। অন্য অভিযোগে তাকে দেয়া যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাজা বহাল রাখা হয়। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।

এর মধ্যে মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ, মিরপুরে কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে হত্যা এবং সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে আরামবাগ থেকে তুলে নিয়ে জল্লাদখানা পাম্পহাউসে নিয়ে জবাইয়ের ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও সংশ্লিষ্টতার কারণে কাদের মোল্লার ১৫ বছর করে কারাদণ্ডের আদেশ হয়।

 

কেরানীগঞ্জের ভাওয়াল খানবাড়ি এবং ঘাটারচরে শতাধিক গ্রামবাসীকে হত্যার ঘটনায় কাদের মোল্লার সংশ্লিষ্টতা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেনি বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে জানানো হয়।

 

 

 

আর মিরপুরের আলোকদী গ্রামে গণহত্যা এবং অন্য এক ঘটনায় হযরত আলী লস্করকে তার স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই বছরের এক ছেলেকে হত্যা এবং লস্করের মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।

 

 

 

 

‘মিরপুরের কসাই’ নামে একাত্তরে পরিচিতি পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর এই নেতাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

 

 

 

ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় রায়ে অসন্তোষ থেকে শাহবাগকে কেন্দ্র করে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে রায়ে ক্ষুব্ধ জামায়াত হরতাল ডাকে, ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করে সড়কে।

 

 

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে করে প্রসিকিউশন বিভাগ আপিল করে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন কাদের মোল্লাও।

 

প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের আপিল শুনানি শেষে গত ২৩ জুলাই কাদের মোল্লার মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে সর্বোচ্চ আদালত। যুদ্ধাপরাধের কোনো মামলায় এটাই প্রথম চূড়ান্ত রায়।

 

যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে।

 

 

সরকারের বর্তমান মেয়াদেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করার ব্যাপক জনদাবির মুখে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেন, বর্তমান মেয়াদেই রায় কার্যকরের বিষয়ে তিনি আশাবাদী।

 

 

 

 

ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার সাড়ে ৫ মাসেরও বেশি সময় পর সুপ্রিম কোর্টে দুই পক্ষের আপিল  শুনানি শেষ হয়।

 

 

আপিলে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

 

২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি  দ্বিতীয় রায়ে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।

 

 

রায়ে বলা হয়, এই জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং একটি রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেননি।

 

 

 

 

এর  মধ্য দুটি অভিযোগে মিরপুরের আলোকদী গ্রামে গণহত্যা এবং অন্য এক ঘটনায় হযরত আলী লস্করকে তার স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই বছরের এক ছেলেকে হত্যা এবং লস্করের মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পরও কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন দেয়া হয়। আর দুটি অভিযোগে দেয়া হয় ১৫ বছর কারাদণ্ড।

 

 

 

 

ষষ্ঠ অভিযোগটি ছিল হযরত আলী লস্করকে তার স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই বছরের এক ছেলেকে হত্যা এবং লস্করের মেয়েকে ধর্ষণ। যাতে আপিল বিভাগ কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দিল।

 

গত ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে সারাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হলে সরকার আইন সংশোধন করে আপিলের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন ও আসামি- উভয় পক্ষের সমান সুযোগ তৈরি করে।

আগে প্রসিকিউশন শুধু খালাসের ক্ষেত্রে এবং আসামিপক্ষ সব ক্ষেত্রেই আপিল করার সুযোগ পেত।

আইন সংশোধনের পর রায়ের এক মাসের মধ্যে উভয়পক্ষই ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিলে কাদের মোল্লা বেকসুর খালাস চান।

 

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণিত অভিযোগগুলোতে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ দণ্ডের পাশাপাশি খালাস পাওয়া অভিযোগে ন্যায় বিচার চায়।

আপিলের পর বেশ কিছু পদ্ধতিগত কাজ শেষে গত ১ এপ্রিল এই মামলার আপিল শুনানি শুরু হয়। এর আগেই আপিল বিভাগে গঠন করা হয় দুটি বেঞ্চ।

 

 

এর একটিতে নেতৃত্ব থাকেন প্রধান বিচারপতি নিজেই, যে বেঞ্চে শুনানি হয় যুদ্ধাপরাধের আপিলের মামলা।

 

 

 

 

প্রথম দিকে ওই বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি ছিদ্দিকুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ছিলেন।

 

তবে বিচারপতি ছিদ্দিকুর রহমান মিয়া অবসরে যাওয়ায় জুন মাস থেকে ৫ বিচারপতি নিয়েই চলছে এই বেঞ্চ।

 

আইনে   আপিল বিভাগে ৬০ দিনের মধ্যে এ ধরনের আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশনামূলক বিধান কার্যকর হলে সিদ্দিকুর রহমান মিয়া পদে থাকাকালেই শেষ হয়ে যেতো কাদের মোল্লা ও সাঈদীর আপিল শুনানি।

 

এই বেঞ্চের দুইজন বিচারককে যুদ্ধাপরাধ মামলা থেকে নিবৃত্ত করতে আবেদন করেছিলেন কাদের মোল্লা। শুনানির এক পর্যায়ে এই বেঞ্চের বাকি চার বিচারকও ওই আবেদন শোনেন। তবে তারা আবেদনটি গ্রহণ করেনি।

 

উভয়পক্ষের আইনজীবীরা ৪০ দিনের মতো এ মামলায় নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। কিন্তু শুনানির এক পর্যায়ে কাদের মোল্লার আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক সংশোধিত আইন তার মক্কেলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই বিচারে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠে।

এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তার জন্য গত ২০ জুন ৭ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতি।

 

সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের বক্তব্যের মাধ্যমে গত ৮ জুলাই অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্য নেয়া শুরু হয়।

 

 

 

এরপর ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, টি এইচ খান, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফের বক্তব্যের মাধ্যমে ২২ জুলাই অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্য শেষ হয়।

 

 

 

 

অ্যামিকাস কিউরিদের মধ্যে রফিক-উল হক, আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, আজমালুল হোসেন ও রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সংশোধিত আইন কাদের মোল্লার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে তারা মনে করেন।

 

 

 

 

তবে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আরিফ বলেন, আইন সংশোধনের আগে কাদের মোল্লার রায় হওয়ায় সংশোধিত আইন কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

 

 

 

 

দণ্ড বাড়াতে প্রসিকিউশনকে আপিলের সুযোগ না দেয়ার পক্ষপাতি হলেও তিনি মনে করেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে কাদের মোল্লার যে আপিল রয়েছে, আদালত চাইলে তার ভিত্তিতেই দণ্ড বাড়াতে বা কমাতে পারে।

 

 

 

 

টিএইচ খানও বলেন, প্রসিকিউশনের আপিলের সুযোগ কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

 

অন্যদিকে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে বিভিন্নমুখী মত আসে অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্যে।

 

 

 

ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মো. কামরুজ্জামানের আপিল উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মদনে জাতীয় সমবায় দিবস পালিত

সুদর্শন আচার্য্য, মদন (নেত্রকোণা)ঃ বঙ্গবন্ধুর দর্শন, সমবায়ে উন্নয়ন এই প্রতিপাদ্যটি সামনে রেখে ...

পর্তুগালে মুক্তি পাচ্ছে বাংলাদেশী সিনেমা “হাওয়া”

পর্তুগাল প্রতিনিধিঃ ১৫ই অক্টোবর হাওয়া পর্তুগালে বানিজ্যিক ভাবে মুক্তি পাচ্ছে বাংলাদেশী সিনেমা ...