Home | আন্তর্জাতিক | একটি মাত্র ছবি ভিয়েতনাম যু্দ্ধের মার্কিন জনমত ঘুরিয়ে দিয়েছিল

একটি মাত্র ছবি ভিয়েতনাম যু্দ্ধের মার্কিন জনমত ঘুরিয়ে দিয়েছিল

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: মার্কিন ফটোসাংবাদিক এডি এডামস ভিয়েতনাম যু্দ্ধের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আলোচিত ছবিগুলোর একটি তুলেছিলেন।

৫০ বছর আগে ভিয়েতকং গেরিলারা যখন তাদের ‘টেট অফেনসিভ’ শুরু করে, সেই যুদ্ধের সময়েই ঘটেছিল ঠান্ডা মাথায় এক ভিয়েতকং বন্দিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা।

এই একটি মাত্র ছবি কিভাবে মার্কিন জনমত ঘুরিয়ে দিয়েছিল, বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ঠিক কিভাবে ছবিটি তোলা হয়েছিল আর কি ঘটেছিল এই ছবিটি তোলার পরে?

ভোঁতা নাকের পিস্তল থেকে গুলিটি বেরিয়ে গেছে। যে হাতে পিস্তলটি ধরা, গুলি বেরিয়ে যাওয়ার পরের মূহুর্তের ধাক্কা সামলাচ্ছে সেই হাত। আর যার মাথার খুলিতে গিয়ে গুলিটি ঢুকছে, সেই বন্দির মুখ কুঁকড়ে যাচ্ছে গুলির আঘাতে।

ছবির ফ্রেমে বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে এক সৈন্য। ঘটনার আকস্মিকতায় তার মুখ যেন বিকৃত হয়ে গেছে।

একটা মানুষ যে মুহূর্তে মারা যাচ্ছে, ঠিক সেই মূহূর্তের এই ছবিটির দিকে তাকিয়ে অনেকের মনেই হয়তো বিচিত্র সব অনুভূতি খেলা করবে: একটা ধাক্কা, এক ধরণের মানসিক পীড়ন এবং কিছুটা অপরাধবোধ।

ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা এই ছবিটিতে ঠিক সেই মূহুর্তটি ধরা পড়েছে যে মূহুর্তে আসলে বুলেটটি গিয়ে ঢুকছিল লোকটির মাথায়। এই ঘটনাটি ‘সায়গন এক্সিকিউশন’ নামে পরিচিত।

ছবিতে যাকে গুলি করতে দেখা যাচ্ছে তিনি দক্ষিণ ভিয়েতনামের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুয়েন নক লোয়ান। আর যাকে গুলি করা হচ্ছে তিনি একটি ভিয়েতকং গেরিলা গ্রুপের নেতা নুয়েন ভ্যান লেম।

এই ছবিটি ফটোসাংবাদিক এডি এডামসকে রাতারাতি বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল। সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন ভাষার সংবাদপত্রে এটি ছাপা হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা এবং নৈরাজ্য এই একটি ছবিতে যেভাবে ধরা পড়েছিল, তার তুল্য আর কোনো ছবি নেই।

যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন জনমত গড়ে তুলতেও অবদান রাখে ছবিটি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ যে আসলে জেতার নয়, সেই মনোভাব প্রবল হতে থাকে মানুষের মধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডলফ ব্রিসকো সেন্টার ফর আমেরিকান হিস্টরি’তে সংরক্ষণ করা আছে এডি এডামসের অনেক আর্কাইভ ছবি, দলিল এবং চিঠিপত্র।

এই সেন্টারের পরিচালক বেন রাইট বলেন,একটা স্থিরচিত্রে এমন একটা ব্যাপার থাকে, যা ছবিটি যারা দেখছেন তাদেরকে খুব গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং সেটা তাদের সঙ্গে থেকে যায় বহু বছর।

‘এই একই ঘটনার যে ভিডিও ফুটেজ আছে, সেটিও কিন্তু বীভৎস। কিন্তু সেটা দেখে দর্শকের মধ্যে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় না।’

কী ঘটেছিল সেদিন:

১৯৬৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সায়গনের রাস্তায় এই ছবিটি তুলেছিলেন এডি এডামস। পিপলস আর্মি এবং ভিয়েতকং গেরিলারা টেট অফেনসিভ শুরু করার দুদিন পরের ঘটনা সেটি। সেদিন আসলে ঠিক কী ঘটেছিল, তার পুরোটা এই ছবি দেখে বোঝা সম্ভব নয়।

‘টেট অফেনসিভ’ ছিল কমিউনিস্ট গেরিলাদের এক আকস্মিক অভিযান। অনেকগুলো শহর টার্গেট করে একযোগে হঠাৎ এই আক্রমণ চালানো হয়। দক্ষিণ ভিয়েতনামের বাহিনী এবং মার্কিন বাহিনী রীতিমত হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে এই হামলার মুখে।

সায়গনের রাস্তায় রাস্তায় চলছিল খণ্ড লড়াই। দক্ষিণ ভিয়েতনামের বাহিনী ভিয়েতকং গেরিলাদের একটি গ্রুপের নেতা নুয়েন ভ্যান লেমকে একটি গণকবরের পাশ থেকে আটক করে। সেই গণকবরে ছিল ৩০ জন বেসামরিক মানুষের লাশ।

লেমকে যখন সেনারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তখন এডি এডামস তার ক্যামেরা হাতে তাদের অনুসরণ করেন। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুয়েন নক লোয়ানের জীপের কাছে।

ব্রিগেডিয়ার লোয়ান দাঁড়িয়ে ছিলেন লেমের পাশে। এরপর তিনি তার পিস্তলটি লেমের দিকে তাক করেন।

‘আমি ভেবেছিলাম হয়তো লেমকে ভয় দেখানোর জন্যই তিনি পিস্তল তুলেছেন। তাই আমি স্বাভাবিকভাবেই আমার ক্যামেরা দিয়ে ছবিটা তুলি’- পরবর্তীকালে বলেছিলেন এডি এডামস।

বলা হয়ে থাকে লেম নাকি ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের এক বন্ধুর স্ত্রীসহ ছয়জনকে খুন করেছিলেন।

ব্রিগেডিয়ার লোয়ান তাক করা পিস্তলের ট্রিগার টানলেন।

‘যদি আপনি দ্বিধা করেন, যদি আপনি আপনার দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে সৈন্যরা আপনাকে মানবে না’- নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন তিনি।

‘টেট অফেনসিভ’ শুরু হওয়ার প্রথম ৭২ ঘন্টায় ব্রিগেডিয়ার লোয়ান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। সায়গনের যেন পতন না হয়, সেজন্যে তিনি সৈন্যদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছিলেন।

এডি এডামস বলেছিলেন, এ্ই ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে তার মনে হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার লোয়ান একজন ঠান্ডা মাথার হত্যাকারী। তবে ভিয়েতনামের বেশ কিছু এলাকা তার সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর পর এডি এডামস তার মনোভাব বদলান।

ভিয়েতনাম থেকে পাঠানো এক লেখায় তিনি বলেছিলেন, ব্রিগেডিয়ার লোয়ান ছিলেন সেই সময়ের ভিয়েতনামের সৃষ্টি।

এই ছবির জন্য পরের বছর পুলিৎজার পুরস্কার পান এডি এডামস। ছবিটি প্রচুর প্রশংসা কুড়ালেও সারা জীবন এটির স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফিরেছে।

‘একজন মানুষ আরেক মানুষকে হত্যা করছে, আর এই ছবি দেখিয়ে আমি অর্থ পাচ্ছি’- দুঃখ করে তিনি বলেছিলেন।

কী ঘটেছিল ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের ভাগ্যে:

এডি এডামস এবং ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের মধ্যে যোগাযোগ অক্ষুন্ন ছিল আরও বহু বছর। ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষের দিকে ব্রিগেডিয়ার লোয়ান পালিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে ফেরত পাঠাতে চেয়েছিল বিখ্যাত এই ছবিটির কারণেই। তারা এডি এডামসে অনুরোধ করেছিলেন ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে। কিন্তু এডি এডামস উল্টো ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের পক্ষে সাক্ষ্য দেন।

তবে শেষ পর্যন্ত ব্রিগেডিয়ার লোয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি দেয়া হয়। তিনি ওয়াশিংটন ডিসি-তে ভিয়েতনামী খাবারের একটি রেস্টুরেন্ট খোলেন।

তবে অতীত তাকে ছাড়েনি। তার বিগত দিনের ইতিহাস জানাজানি হওয়ার পর রেস্টুরেন্ট ব্যবসা মার খায়। অনেকে নাকি তার রেস্টুরেন্টের টয়লেটে তার বিরুদ্ধে আজে বাজে কথা লিখে আসতো।

এপি বার্তা সংস্থায় সেসময় এডি এডামসের ফটো এডিটর ছিলেন হল বুয়েল।

তিনি বলেন, এই একটি ছবি পুরো ভিয়েতনাম যু্দ্ধের নিষ্ঠুরতাকে ধরে রেখেছে।

‘যে কোনো প্রতীকের মতোই এই একটি ছবি আসলে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত সব যুদ্ধের বর্বরতাকে মূর্ত করে রেখেছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বঙ্গবন্ধুর আলোচিত কিছু ছবি

বিডিটুডে ডেস্ক : বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতি ...

ইসরায়েল-আমিরাতের অস্ত্র চুক্তি

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : ইসরায়েলের সঙ্গে বিশাল আকারের সামরিক চুক্তি সই করেছে সংযুক্ত আরব ...