ব্রেকিং নিউজ
Home | ব্রেকিং নিউজ | আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ‘‘ঢেঁকি’’

আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ‘‘ঢেঁকি’’

আলতাফ হোসেন সরকার, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) : কথায় আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙ্গে, কিংবা অনুরোধের ঢেঁকি গেলা। ঢেঁকি নিয়ে সমাজে নানান কথা প্রচলিত থাকলেও কালের বিবর্তনে দেশের গ্রামাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এক কালের কৃষক-কিষানীর ধান ভাঙ্গার প্রধান যন্ত্র ঢেঁকি। অতীতে গ্রাম বাংলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ধান থেকে চাল তৈরীর জন্য কিংবা চালের আটা তৈরীর জন্য একমাত্র ঢেঁকিই ছিল ভরসা। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকি এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। এক সময় ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি লুকিয়ে ছিল আমাদের গ্রামবাংলার প্রাচীন জনপদে। ভোরের আযানের পাশাপাশি স্তব্ধতা ভেঙে ঢেঁকির কিচির মিচির, ধপাস ধপাস শব্দে ছড়িয়ে পড়ত গাঁও গ্রামের চারিদিকে। এখন আর সেই শব্দ নেই। চোখে পড়ে না বিয়ে সাদির উৎসবের ঢেঁকি ছাঁটা চালের ফিরনি-পায়েস। অথচ একদিন ঢেঁকি ছাড়া গ্রাম কল্পনা করাও কঠিনতর ছিল। যেখানে বসতি সেখানেই ঢেঁকি।

কিন্তু আজ তা আমাদের আবহমান গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আধুনিক যুগে চাকচিক্কের আধিক্যে হারিয়ে গেছে সেই ঢেঁকি ছাঁটা চাল। এখন সর্বত্রই অসংখ্য যান্ত্রিক ধান ভাঙার মেশিন ঢেঁকির সেই মধুময় ছন্দ কেড়ে নিয়েছে। বর্তমান পাড়ায় পাড়ায় ধান ভাঙ্গা হাসকিং মিল এমনকি ভ্রাম্যমান মিল প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান ভেঙ্গে দেয়ায় ঝকঝকে চাল, খাটুনি কম ও সময় সাশ্রয় হওয়ায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না। এক সময় ঢেঁকি ছিল রাজারহাট উপজেলার গ্রাম-গঞ্জের চাল ও চালের গুঁড়া তৈরির একমাত্র মাধ্যম। রাজারহাটের বধূঁরা ঢেঁকিতে চাল ভাঙতো গভীর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত । বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম বাংলার সেই ঢেঁকিগুলো রাজারহাট উপজেলার গ্রামগুলোতে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউপির মেদিনিপুর গ্রামের বাবলু মিয়ার বাড়িতে ঘরের ভিতরে একটি ঢেঁকি পাতানো দেখতে পাওয়া যায়। ঢেঁকি ছাঁটা চালের পান্তা ভাত পুষ্টিমান ও খেতে খুব স্বাদ লাগে। বিশেষ করে ঢেঁকি ছাঁটা চালের ফিরনি- পায়েস ও পিঠা-পুলি খুব স্বাদ হয়। মেশিনের তৈরী আটা দিয়ে এসব খাবারের তেমন কোন স্বাদ হয় না। ৫০ উর্দ্ধ গৃহিনী আকলিমা, জাহানারা, জরিনা বলেন ‘‘হামরা ঢেঁকিত ধান বানিয়া ধান রান্ধিয়া ছাওয়া পোয়া মানুষ করছি বাহে। এখন কার বউ ছাওয়ালরা ঢেঁকি কি জিনিস চিনেয় না’’। বর্তমান প্রজন্মের গৃহিনী জেসমিন আক্তার, মর্জিনা, শেফালী রানী বলেন ঢেঁকি নাম শুনেছি স্পষ্ট ধারনা নাই। মেশিনেই ধান ভাঙ্গা হয়। বর্তমান যুগে কালের বিবর্তনে গ্রাম-বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকির হয়তো আর দেখাই মিলবে না। আর কিছু দিন পরে নতুন প্রজন্ম হয়ত ঢেঁকির কথা শুনলে সেটি কি জিনিষ, তা বুঝানো মুশকিল হয়ে পড়বে। হয়তো বিভিন্ন জাদুঘরে গিয়ে দেখা যাবে এই ঢেঁকি। আর এ যুগের ছেলে মেয়েদের ছবি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে ঢেঁকি শিল্প কি ছিল। বর্তমানে এই ঢেঁকির গল্প শোনা যায় শুধু নানি-দাদিদের মুখে মুখে। আধুনিক সভ্যতার বিকাশে সব কিছু বদলে যাচ্ছে। এক সময় সভ্যতার প্রয়োজনে ঢেঁকির আর্বিভাব ঘটেছিল। আর এখন গতিময় সভ্যতার যাত্রা পথে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষেই তা বিলুপ্ত হতে চলছে। আবহমান বাঙালির হাজার বছরের গ্রামীণ ঐতিহ্য ঢেঁকি শিল্প, বর্তমান ইতিহাসের সেই স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে চিরদিন-চিরকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

তালায় জাতীয় পার্টি ও আ.লীগের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, আহত-৮

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার তালায় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে জাতীয় ...

অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কক্সবাজার প্রতিনিধি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, রোহিঙ্গাদের যারা আগুনে ঘর-বাড়ি হারিয়েছেন ...