Home | ফটো সংবাদ | আদুরী মামলা এবং সংশ্লিষ্ট আইনের দুর্বলতা

আদুরী মামলা এবং সংশ্লিষ্ট আইনের দুর্বলতা

Aduriজাহাঙ্গীর আলম সরকার : শিশু আদুরীর করুণ পরিণতি সকলের মন নাড়া দিয়েছে। কিন্তু তার নির্যাতনের বিচারে মামলা হয়েছে যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে, সেখানে রয়েছে বেশ কিছু দুর্বলতা। আদুরীর মামলাটিতে আইনের ফাঁক গলিয়ে অপরাধীর পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ দেখছেন মানবাধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর আলম সরকার
আদুরী নামের ৯ বছরের শিশু গৃহকর্মীটিকে নির্যাতনের খবরটি সম্প্রতি সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে সংবাদকর্মী, সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীরা বেশ উচ্চবাচ্য করছেন। বিষয়টি সত্যি অমানবিক তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু এটি প্রথম কোনো ঘটনা নয় যে অবাক হতে হবে। এমন অনেক ঘটনাই প্রতিদিন ঘটে চলছে বাংলাদেশে কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আজ যারা প্রতিবাদ করছেন তারাও ২-৪ দিন পর চুপ হয়ে যাবেন। পুকুরের পানি শান্ত হওয়ার পর চাপা পড়ে যাবে আদুরীর নাম। নতুন কোনো ঘটনা হবে সংবাদ শিরোনাম। বিজ্ঞ আইনজীবীরা ব্যস্ত হয়ে উঠবেন নতুন মামলা নিয়ে, সংবাদকর্মীরা নতুন সংবাদের খোঁজে এবং মানবাধিকার কর্মীরা অন্য কিছু নিয়ে প্রতিবাদের অভিনয়ে। আর এমনই এক পরিস্থিতিতে হয়তো আদুরীর পরিবার দৈনদশার কারণে বিভিন্ন চাপে পড়ে বিচারপ্রাপ্তির আগ্রহই হারিয়ে ফেলবেন। একজন আইনজীবী হিসেবে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এরকমটাই আন্দাজ করতে পারি। আমি প্রত্যাশা করি অন্তত ৯ বছরের এ শিশুটির প্রতি যে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে তার বিচার হোক। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশ যেন আর কোনো নওরিনদের কাছে পরাজিত না হয়।
একটা সময় ছিল যখন দেশে দেশে দাস ব্যবসার প্রচলন ছিল। মানুষ মানুষকে পণ্য করে বিক্রি করত। যুগ যুগ ধরে তাদের ওপর চালানো হতো পাশবিক নির্যাতন, লঙ্ঘিত হতো তাদের মানবাধিকার। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবসান হয়েছে দাসপ্রথার। কিন্তু আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ভিন্নরকম। বাড়িতে কাজের মেয়ে রাখার মাধ্যমে সেই পুরনো খারাপ প্রথার প্রচলন এখনো রয়ে গেছে। এসব মেয়েশিশু প্রতিনিয়ত দুর্বিষহ সহিংসতার শিকার। কাজের মেয়েরাও মানুষ, তাদেরও আছে মুক্তভাবে বেঁচে থাকার অধিকার তা অনেকেই মানতে চায় না। আমাদের দেশের দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারগুলোর মেয়ে সন্তানরা জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেকটা বাধ্য হয়েই জড়িয়ে পড়ে বাসাবড়িতে বাধ্যতামূলক শ্রমে। যেখানে প্রতিনিয়ত তাকে শরীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
এখন নির্যাতিত আদুরী বর্তমান পরিস্থিতিতে সুবিচার পেতে পারে কোন প্রক্রিয়ায়? কেননা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এ রয়েছে নানা ত্রুটিবিচ্যুতি। জন্ম থেকেই এ আইন একটি অসম্পূর্ণ আইন। সে কারণেই ১৯৯৫ সালের আইনটি বাতিল করে ২০০০ সালে নতুন করে প্রণয়ন করার প্রয়োজন হয়েছিল। পাশাপাশি ২০০৩ এবং ২০০৬ সালে সংশোধন করতে হয়েছে। এরপরও বহুদিক থেকেই আইনটি অপূর্ণাঙ্গই থেকে গেছে। কেননা আজ আদুরী নির্যাতনের বিচার এ আইনের আওতায় আনা আর বিচার না চেয়ে বসে থাকা প্রায় একই কথা। আদুরীকে যে ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে তাতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রতিকার যে সে পাবে না সে কথা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। ফলে আসামিদের সাজা প্রদান করা খুব একটা সহজ কাজ হবে না। কেননা এ আইনে কেবল দাহ্য পদার্থ দ্বারা পুড়ে গেলেই সাজার সুযোগ থাকে। কিন্তু বেত্রাঘাত, গরম খুন্তি, লোহা, ইস্ত্রির ছ্যাকা, গরম পানি ঢেলে দেয়ার শাস্তির কথা এ আইনে নেই। আইনের এসব ফাঁক এবং জটিলতার কারণে আসামিরা ছাড়া পেয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আদুরী নির্যাতনের ঘটনার ন্যায়বিচারের জন্য ১৮৬০ সালের দ-বিধি আইনের ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫ এবং ৩২৬ ধারায় মামলা করা উচিত। এখানে দ-বিধির ৩২৬ ধারা একটি আমলযোগ্য এবং জামিন ও আপস অযোগ্য একটি অপরাধ। ফলে এ ধারার অধীনে মামলা দায়ের করে আদুরী প্রতিকার পেতে পারে।
আদুরী নির্যাতনের বিচার না হলে কিংবা আইনের ফাঁক গলিয়ে নির্যাতনকারীরা বের হয়ে গেলে এ নির্যাতনকারীরাই ভবিষ্যতে আরো গুরুতর অপরাধ করতে উৎসাহিত হবে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় বাসাবাড়িতে কর্মরত মেয়েশিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাদের কাজের পরিবেশ ও বাস্তবতা ভিন্নতর। নারীবাদী লেখিকা ও সংগঠক এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর উইমেন্স গ্লোবাল লিডারশিপের নির্বাহী পরিচালক শার্লোট বানচের মতে, বেশিরভাগ মেয়ে যারা বাড়িতে কাজ করে তারা প্রতিনিয়ত নির্যাতন, গালাগাল, ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব ও হত্যার শিকার হয়ে থাকে। অথচ বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাদের মুখোমুখি হতে হয় নানারকম জটিলতায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এসব মেয়েশিশুর প্রতি চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করা হয়।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক নারী গবেষণা কেন্দ্রের সভানেত্রী গীতা রাওগুপ্তার মতে, প্রায় ১০০ কোটি মানুষ অর্থাৎ প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন ১০-১১ বছর বয়সী শিশুর শতকরা ৮৫ ভাগই বাস করে উন্নয়নশীল বিশ্বে। উন্নয়নশীল বিশ্বে শতকরা ৫৯ ভাগ মেয়ে এবং ৪৮ ভাগ ছেলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় না। বিশ্বে ১০-১৪ বছর বয়সী ৭ কোটি ৩০ লাখ কর্মজীবী হিসেবে গৃহস্থালি বা বসতবাড়ির কাজে কর্মরত। ওপরের তথ্যগুলো থেকে এ কথা বলা যায় যে সবচেয়ে শোষণমূলক কাজগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে গৃহপরিচারিকার কাজ; যেখানে কর্মরত শিশুদের শতকরা ৯০ ভাগই কন্যাশিশু। বাসাবাড়িতে কর্মরত এসব মেয়ে শিশুর জন্য নেই কোনো নীতিমালা, নেই কাজের কোনো পরিসীমা, এমনকি নেই ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির নূ্যনতম নিশ্চয়তা। এ ব্যাপারে নিয়ম-নীতি করা হোক তা সবারই কাম্য।
আসুন আমরা নির্যাতিত গৃহকর্মীর চোখে পৃথিবীকে দেখি। আদুরীর চোখে যদি আমরা পৃথিবীকে দেখতে পারি তবে আইনজীবী, সংবাদকর্মীসহ সুশীলশ্রেণির কণ্ঠস্বর আরো বলিষ্ঠ হবে। এভাবেই আমরা আদুরীর ন্যায়বিচারের রাস্তাকে প্রশস্ত করতে পারি এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিকে আরো জোরালো করতে পারি।
jahangir alam sarkar
জাহাঙ্গীর আলম সরকার :
লেখক : আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা চেয়ে রিট আবেদনের শুনানি মুলতবি

স্টাফ রির্পোটার : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ...

ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চালু রাখার ঘোষণা

স্টাফ রির্পোটার : স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমন্বয় করে ভোটে লড়া ...