Home | শিল্প সাহিত্য | ফিচার | আদালতে দুর্নীতি বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা

আদালতে দুর্নীতি বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা

জাহাঙ্গীর আলম সরকার : একজন আইনজীবী হিসেবে আদালতে মামলা পরিচালনা করতে যেয়ে আমি ব্যক্তিগত ভাবে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এ অভিজ্ঞতা একদিনে হয়নি বরং ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমেই তা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। তাই দ্যার্থহীন কন্ঠে আমি এ কথা বলতে পারি যে, আমাদের আইনজীবীদের মধ্যে একটা বড় অংশই সরাসরি দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত। আমি নিজে একজন আইনজীবী ফলে নিজের পেশা সম্পর্কেই প্রথম অভিযোগটি উত্থাপন করলাম। তবে এ কথাও সত্য যে, আদালতের দুর্নীতির সাথে শুধু আইনজীবীরাই জড়িত নয় বরং আরও বেশ কিছু সুযোগসন্ধানীরাও জড়িত, যারা আদালতে নানা পেশায় কর্মরত।
আদালত এলাকায় দুর্নীতি, প্রতারণা, বিচারপ্রার্থীদের মামলার প্রক্রিয়া সম্পর্কে না জানা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে আদালতে দ্রুত ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। ন্যায়বিচার পেতে এসে নানা ধরনের অবিচারের শিকারও হচ্ছেন বিচারপ্রার্থী সাধারন মানুষ। এ প্রবণতা দিন দিন বাড়ার কারনে অপরাধ বাড়ছে, ফলে আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি হচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে অবৈধ লেনদেনের কারনে উৎকোচই হয়ে উঠছে বিচারের প্রধান মানদন্ড। আদালতের কর্মচারীদের দুর্নীতি, আইনের অপূর্ণতা, প্রতারক মুহুরি, গ্রাম্য দেওয়ানী ও দালালদের দৈরাত্ব, স্থানীয় পেশকার এবং অসাধু আইনজীবীরা আদালতের পবিত্রতাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। এই দুর্নীতিবাজদের কারনে আইনপেশাও আজ কুলশিত। সীমাহীন দুর্নীতির কারনে আজকাল মানুষ একেবারেই বিপদে না পড়লে আদালতের দারস্থ হতে চায় না। সহজ করে বললে বলতে হয়- অনেকটা বাধ্য হয়েই মানুষ আদালতের দারস্থ হন, এই ধারনাকে সাথে নিয়েই যে তারা হয়তো ন্যায়বিচার পাবেন না।
এক শ্রেণীর মুহুরি নির্ভর আইনজীবীরা প্রতিনিয়ত উৎকোচ গ্রহণ করে আদালত প্রাঙ্গনকে করেছে অপবিত্র। এই প্রক্রিয়ায় উৎকোচ গ্রহণ করতে করতে তাদের মানষিকতা এমনটাই হয়েছে যে, তাঁরা এ জাতীয় কাজকে দুর্নীতি মনে না করে তাদের পেশাগত দায়িত্ব বলেই ভাবতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে। ফলে সমস্যা আরও ঘনিভুত হতে শুরু করেছে। এ সকল দালাল নির্ভর নৈতিকতা বিবর্জিত কিছু আইনজীবীদের মানষিকতার পরিবর্তন হওয়া দরকার। দুর্নীতি বন্ধের জন্য তাদেরকেই সচেতন করে তোলা উচিৎ। আদালতে সৎ আইনজীবীরাও রয়েছেন যারা সৎতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন যাদেরকে খুজে বের করা দরকার। বিচারপ্রার্থীদের উচিৎ দালালদের পরিহার করে সে সকল আইনজীবীদের দারস্থ হওয়া।
আদালতের দুর্নীতি বন্ধে সকলকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে। আইনজীবীরা যদি তাদের মানসিকতা পরিবর্তন করেন তবে আদালতে বহু দুর্নীতিই আর থাকবে না। পাশাপাশি সহকারী জজদের বদলির মতো স্থানিয় পেশকারদেরও ঘন ঘন বদলি করা উচিত। কারণ দুর্নীতির সবচেয়ে বড় আখড়া সেখানেই। আদালতগুলোতে অনেক সময় বিচারকরাও সময় দেন না, বাদি আসে না, আইনজীবীরা অনুপস্থিত থাকেন ফলে বিচারপ্রার্থীরা মারাত্বক ভোগান্তির শিকার হন। এর ফলে পেশকার, মুহুরিরাও সুযোগ নেয়। পরবর্তী তারিখ দিতে পেশকার টাকা ছাড়া ফিরেও তাকায় না। বিচারকেদের পক্ষে তারিখ দেয়া সম্ভব হয় না, ফলে পেশকার বনে যায় বিচারক। আর পেশকার যখন বিচারক, অন্যদিকে মহুরি যখন আইনজীবী তখন সে বিচারপ্রার্থীর অবস্থা কি হতে পারে একবার অনুমান করলেও শরীর শিউরে উঠে। নি¤œ আদালতে মামলার জট বেশি, ফলে অনেক আদালতে দেখা যায় তারিখ দেয়ার কাজটি পেশকারের জন্য বরাদ্দ থাকে। ফলে তারিখ দেয়া ও নেয়া নিয়ে চলে সীমাহীন দুর্নীতি।
ক্ষেত্র বিশেষে লক্ষ করা যায় পেশকাররা আদালত চলাকালিন সময়েই আইনজীবী ও বিচারকদের সামনেই উৎকোচ গ্রহন করে। আদালতের এ রকম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ কোন উচ্চবাচ্য করে না। এ সকল বিষয়ে প্রতিবাদ করলে কিছু আইনজীবী যুক্তি প্রদর্শন করেন- ’এ সকল পেশকাররা ক’ টাকাই আর বেতন পায়। যদি কিছু টাকা উৎকোচ গ্রহন না করে তবে কিভাবে চলবে ওদের সংসার?’ আসলে প্রকৃত সত্যটা হচ্ছে এ রকম যুক্তি যারা দিয়ে থাকেন তাঁরা প্রকৃতপক্ষে তাদের নিজেদের দুর্নীতি এবং অনিয়ম আড়াল করবার জন্যই এমনটা বলে থাকে। সত্য কথা বলতে কি খোজ নিয়ে দেখলে দেখা যাবে তারাই হচ্ছে সে সকল আইনজীবী যারা পবিত্রতাকে নষ্ট করে আদালতকে দুর্নীতিগ্রস্থ করেছে।
মামলা করতে এসে বিচারপ্রার্থীরা প্রথমে দালালদের খপ্পরে পড়ে। দ্বিতীয়ত কোর্টে এসে দুর্নিতীগ্রস্থ পেশকার, মুহুরি, আইনজীবীদের চাহিদা মেটাতে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। বিচারের জন্য এস নিঃস্ব হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বাংলাদেশের নি¤œ আদালতে মামলা করতে আসা বেশির ভাগ নারী-পুরুষই অশিক্ষিত ও গরিব। এরা ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকেই দালালের খপ্পরে পরে। ফলে তাদের ভোগান্তীর কোন শেষ নেই। অন্যদিকে পারিবারিক আদালতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিবাদি অনুপস্থিত থাকার চেষ্টা করে। অথবা বিবাদিরা পেশকার-মুহুরির সাথে যোগাযোগ করে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে মামলার তারিখ পিছিয়ে দেয়।
এ রকম অবস্থা চলতে দেয়া যেতে পারে না। আদালতের এ অবস্থার পরিবর্তন করা উচিৎ। যেহেতু আমাদের কাছে আলাদিনের কোন আশ্চর্য প্রদিপ নেই যে আমরা ’আদেশ’ প্রদান করলেই কোন দৈত্ব এসে তা তামিল করবে। ফলে আমাদের নিজেদেরকেই দুর্নীতি বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেককেই যার যার অবস্থান থেকে ঘুরে দাড়াতে হবে। সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যে সকল উদ্যোগ গ্রহন করা যেতে পারে তা হচ্ছে- আইনজীবীদের মানষিকতা পরিবর্তন, বার এবং বেঞ্চের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করা, পেশকারদের ঘন ঘন বদলি করা, আদালতে কর্মচারীদের কর্মকান্ড তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং সকল শ্রেনী-পেশার মানুষদের মধ্যে আইন ও বিচার পদ্ধতির বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে সচেনতার বাড়ানো ইত্যাদি।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমরা সকলে যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করি তবে শুধু আদালত নয় বরং সমগ্র বাংলাদেশ দুর্নীতি মুক্ত করা সম্ভব হবে। এটা আমাদের সকল আইনজীবীদের জন্য লজ্জা যে সাধারন বিচারপ্রার্থীরা আইনজীবীদের উপর ভরসা পান না। এ দুর্নামের কালিমা আমাদেরকে পরিস্কার করতেই হবে। আইনজীবীরা যদি উদ্যোগ গ্রহন করেন তবে শুধু দুর্নীতি নয় করং সকল অনিয়মকে ঝেরে মুছে বাংলাদেশ ঘুরে দাড়াতে পারবে। তাই আদালতকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাষন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনজীবীদের উদ্যোগ গ্রহন করা দরকার।
জাহাঙ্গীর আলম সরকার: আইনজীবী ও মানবাধীকার কর্মী;

ই-মেইল: advsagar29@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বসন্ত এলো এলো এলোরে.

স্টাফ রিপোর্টার :  বসন্ত এলো এলো এলোরে পঞ্চম স্বরে কোকিল কুহুরে মুহু ...

অপারেশনের জন্য প্রস্তুত ৫০০ কেজির সেই নারী

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক :  শরীরের ওজন কমাতে শিগগিরই ভারতে চিকিৎসকের অস্ত্রের নিচে যাচ্ছেন ...