ব্রেকিং নিউজ
Home | সারা দেশ | আজ ভয়াল ১৯৭০’র ১২নভেম্বর দুঃসহ স্মৃতিতে চরফ্যাশন সহ উপকূলবাসীকে আজো কাঁদায়

আজ ভয়াল ১৯৭০’র ১২নভেম্বর দুঃসহ স্মৃতিতে চরফ্যাশন সহ উপকূলবাসীকে আজো কাঁদায়

Bhola Mapআরিফুল ইসলাম রিয়াজ, ভোলা প্রতিনিধিঃ আজ ভয়াল ১৯৭০’র ১২নভেম্বর। দুঃসহ স্মৃতি আজো ভোলার উপকূলীয় জনপদ চরফ্যাশন সহ ভোলার মানুষদের কাঁদায়। ১৯৭০ সালের এ দিনটিতে ঝড়-জলোচ্ছাসে লন্ড-ভন্ড হয়ে গিয়েছিল ভোলার চরফ্যাশন সহ উপকূলীয় অসংখ্য জনপদ। আজ থেকে ৪৩বছর পূর্বে ভোলার উপকূলীয় জনপদ চরফ্যাশন সহ ভোলার লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে। কয়েক লক্ষ গৃহপালিত প্রাণীর ও প্রাণহানি ঘটে সেদিন। একটি বেসরকারী সংস্থার তথ্য মতে, সে দিন ভোলার লক্ষাধিক সহ উপকূলের প্রায় ৫ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটে।তখনকার সময়ে চরফ্যাশন-ভোলার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির খবর নিরুপন করতে ২/৩দিন সময় লেগে যায়। ভোলায় এতো অধিক পরিমানে প্রাণহানির পরও জলোচ্ছাসের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর স্বজনদের হারানোর ক্ষত আজো তারা বয়ে বেড়াচ্ছেন। সেদিন বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী চরফ্যাশনের দক্ষিন ফ্যাশন এলাকার আবুল বাশার জানায়, ১৯৭০সালের এ দিনটি ছিল রোজার দিন। গুড়ি-গুড়ি বৃষ্টি সহ দমকা হাওয়া বইছিল সারাদিন। উপকূলীয় এলাকা চরফ্যাশন সহ উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে প্রায় ২শত কিলোমিটার বেগে বয়ে যায় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে উপকূলীয় এলাকা চরফ্যাশন সহ উপকূলীয় জনপথগুলো মুহুর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়ে যায়। রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ী, মাঠ-ঘাট’র উপর জলোচ্ছাসে একাকার হয়ে যায়। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে শত শত বনি আদমের মৃতদেহ গাছের ডালে ঝুলে ছিল। বিভিষিকাময় সেদিনে মৃতমানুষগুলোর লাশের দাফনের লোক ও পাওয়া দুস্কর ছিল। প্রত্যেকেই যার যার মৃত স্বজনদের হন্যে হয়ে বিভিন্ন স্থানে খুঁজতে থাকে। বহু মানুষ তাদের প্রিয় স্বজনদের লাশও খুঁজে পায়নি। সেদিন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে গৃহহীন হয়ে পড়ে উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ। চরফ্যাশন  উপজেলা ত্রান ও পূণর্বাসন অফিস সূত্রে  জানা গেছে, ভয়াল সেদিন উপকূলীয় জনপদ ভোলার চরফ্যাশনের ঢালচর-পাতিলা ও কুকরী-মুকরীর মানুষের বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঢালচর ও কুকরীর অধিকাংশ মানুষ সেদিনের জলোচ্ছাসে প্রাণ হারিয়েছে। কুকরী’র আমিনপুরের ষাটোর্ধ জেবল হক জানান, জলোচ্ছাসের পর থেকে দেড়-দু’মাস পর্যন্ত স্বজন হারাদের কান্নায় উপকূলের আকাশ-বাতাস ভাড়ি হয়ে গিয়েছিল। জানা যায়,গত ৪২ বছরের সব কয়টি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের চেয়ে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস ছিল খুবই হিংস্্র। ১৯৭০’র ১২ নভেম্বর হ্যারিকেনরূপী এ ঝড়টি বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, লক্ষীপুর, বরগুনা, খুলনা ও বাগেরহাট সহ ১৮টি জেলায় আঘাত হানে। তৎকালীন সময়ে তথ্য-প্রযুক্তি অনেকটা দুর্বল থাকায় উপকূলের অধিকাংশ মানুষই ঝড়ের পূর্বাভাস পায়নি। ভোলা আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, সেদিন ৮/১০ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছাস হয়েছিল। জলোচ্ছাসের তীব্রতায় কেউ গাছের ডালে, কেউ বা উচু ছাদে আশ্রয় নিয়ে কোনমতে প্রাণে রক্ষা পেলেও ৩/৪দিন তাদের অভূক্ত কাটাতে হয়েছে। লালমোহন উপজেলার মঙ্গল সিকদার গ্রামের মেঘনাথ চন্দ্র শীল স্বজন হারানো একজন। পরিবারের ৬ সদস্যের মধ্যে বেঁচে যাওয়া ওই সময়ের ১২বছরের মেঘনাথ সেদিনের ভয়াল স্মৃতির বর্ননা দিতে গিয়ে বলেন, সেদিন সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। দুপুরের পর থেকে বাতাস আস্তে আস্তে বইতে শুরু করে। বিকাল আনুমানিক ৩টা থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে সন্ধ্যায় বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে বাতাস ও বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটে তার।রাত আড়াইটা-তিনটার দিকে মেঘনা, তেতুলিয়া, বুড়াগৌরাঙ্গ ও বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছাসের পানি বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে ১৪/১৫ফুট উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গোটা জেলা সহ উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যায়। এসময় মির্জাকালু বাজারের সদর রোডে হাটুর উপর পানি উঠে। পানি আসতেছে আসতেছে বলে বাজারের আশ-পাশ থেকে বহু নর-নারী ও শিশু ছুটাছুটি করে মির্জাকালু হাইস্কুলের দোতলায় আশ্রয় নেয়। পরদিন ১৩নভেম্বর ভোরে আস্তে আস্তে পানি যখন নামতে শুরু করে তখন প্রচন্ড বেগে জলোচ্ছাসের পানির স্্েরাতে মাছ ধরা ট্রলার ও লঞ্চ বাজারে চলে আসে। পানিতে ভেসে গেছে অসংখ্য, অগনিত মানুষের লাশ। যেন লাশের মিছিল হয়েছিল সেদিনের জলোচ্ছাসে। গোটা জেলাকে তছনছ করে মৃত্যুপুরীতে পরিনত করে দিয়েছিল। সেদিনের ঝড়ের বর্ননা দিতে গিয়ে মনপুরার ষাটোর্ধ মফিজা বলেন, সেই ভয়াল জলোচ্ছাস ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় অথৈ পানিতে একটি ভাসমান কাঠ ধরে প্রায় মৃতাবস্থায় তিনি পানির তোরে গভীর সাগরের দিকে ভেসে যাচ্ছিলেন। কে বা কারা তাকে উদ্ধার করেছে তিনি তা আজো জানেন না। যখন তার জ্ঞান ফিরেছে তখন তিনি নোয়াখালীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখতে পান। চরফ্যাশনের ঢালচরের মফিজ মিযা জানান, ওই জলোচ্ছাসে ঢালচরে ১৩/১৪ফুট পানি উঠেছিল। প্রলয়ংকরী ওই ঝড়ে তিনি  ৩ছেলে ও ২ মেয়েকে হারিয়েছেন। পরদিন ১৩নভেম্বর ভোরের আলো ফুটতেই দেখা গিয়েছিল বাদুরের মতো মানুষগুলোকে গাছে ঝুলে থাকতে। কেউ মৃত, কেউ বা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। ¯্রােতের টানে অনেকের বস্্র ভেসে গেছে। চারদিকে ছিল শুধু লাশ আর লাশ। একটুকরো কাপড় পেলে আব্রু ঢেকেছিল জীবিতরা। সেই ঘূীর্ণঝড় ও জলোচ্ছাসে বিনা জানাজায় বহু মৃতদেহ কবর দেয়া হয়। ভোলার ইতিহাস যতদিন থাকবে  ততদিন ১২নভেম্বর  ভয়াল এ  দিনটির কথা ভোলাবাসীর স্মরনে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রাণীশংকৈল ইউএনও’র ১’শ টি হুইল চেয়ার প্রদান 

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল সুলতান জুলকার নাইন কবির স্টিভ এর ...

রাণীশংকৈল রামরাই দিঘী বিনোদন পার্কের উদ্ধোধন

ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলের ঐতিহ্যবাহী রামরাই দিঘীতে নতুনভাবে গড়ে তোলা বিনোদন পার্কের উদ্বোধন করেন ...